বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন
ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আগামী ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জি২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মস্কোকে পুনরায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কাঠামোর মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংবাদমাধ্যমের সামনে এই আমন্ত্রণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান যে, এই শীর্ষ সম্মেলনটি রুশ প্রেসিডেন্টের জন্য কেবল মার্কিন নেতার সঙ্গেই নয়, বরং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের অন্যান্য প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করবে। মার্কিন প্রশাসন আশা প্রকাশ করেছে যে রুশ প্রেসিডেন্ট এই আমন্ত্রণ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন এবং সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন। তবে পুতিন এই সম্মেলনে অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি মস্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রুশ প্রেসিডেন্ট এই বৈঠকে যোগ দিলে ২০১৯ সালের পর এটি হবে জি২০ সম্মেলনে তার প্রথম সশরীর উপস্থিতি এবং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতায় আসার পর এটি হবে তার দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্র সফর। এর আগে সর্বশেষ ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে আলাস্কায় পুতিনকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এদিকে এমন এক কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেও ইউক্রেন সংঘাতে কোনো স্থায়ী শান্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। চলমান এই সংকটের মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে তীব্র ড্রোন হামলা চালিয়েছে রুশ সশস্ত্র বাহিনী। এই সামরিক আগ্রাসনে অন্তত দু’জন সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং শহরটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কূটনীতিতে ভিন্নমতের গুরুত্ব তুলে ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্তব্য করেছেন যে, শুধুমাত্র আদর্শগত মিল রয়েছে এমন মিত্রদের সঙ্গে বৈঠক করলে কূটনৈতিক পরিবেশ অনুকূল হতে পারে, কিন্তু তাতে জটিল কোনো সমস্যার সুরাহা হয় না। প্রকৃত সংকটের সমাধানের জন্য যাদের সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে, তাদের মুখোমুখি বসতেই হয় বলে তিনি জোরালো মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখার জন্য বিশেষ চাপ প্রয়োগ করে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বৈশ্বিক বাজারে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে এ ধরনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলাকে দায়ী করেছেন তিনি। চলতি মাসের শুরুর দিকে মস্কো ও কিয়েভ একটি আংশিক জ্বালানিসংক্রান্ত যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু এর পরেও দুই পক্ষ থেকে একে অপরের জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বের প্রধান প্রধান পরাশক্তি এবং উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে গঠিত একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ফোরাম হলো জি২০ বা গ্রুপ অব টুয়েন্টি। বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে ১৯৯৯ সালে এই জোটটি গঠিত হয়েছিল। বর্তমান বিশ্বে জি২০ জোটটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, কারণ এটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় পঁচাশি শতাংশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পঁচাত্তর শতাংশ এবং বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। এই আন্তর্জাতিক জোটে ১৯টি স্বাধীন দেশ এবং দুটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সংস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া দুটি আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে এই জোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন বা এইউ যুক্ত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই একক সিদ্ধান্ত ও আমন্ত্রণ পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরের সম্মেলনে অতিরিক্ত কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।