রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন
অমর গুপ্ত, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে সরকারিভাবে ধান কাটাই ও মাড়াইয়ের জন্য কম্বাই হারভেস্টার মেশিনে একর প্রতি দূরত্ব ভেদে সাড়ে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কম্বাই হারভেস্ট মেশিন মালিক ও কৃষকদের জানানো হয়েছে।
সরকারিভাবে দূরত্ব ভেদে কম্বাই হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটাই ও মাড়াই ভাড়া একর প্রতি সাড়ে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি এই নিদের্শনাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে উপজেলার কম্বাই হারভেস্টার মেশিনের মালিকরা সিÐিকেটের মাধ্যমে নিজ খেয়ালখুশি মতো কৃষকদেরকে জিম্মি করে একর প্রতি আদায় করছেন দূরত্ব ভেদে ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। এতে কৃষকদের প্রতি একরে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে সাড়ে ৪ হাজার বেশি গুণতে হচ্ছে। তবে দূরত্ব একটু বেশি এবং প্লাবিত হলে ভাড়াও বেড়ে যাচ্ছে। এক প্রকার কৃষকদের জিম্মি করেই আদায় করা হচ্ছে এসব হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটাই ও মাড়াই ভাড়া।
এদিকে চলতি ধান কাটা মৌসুমে ধান কাটা কৃষিশ্রমিকের তীব্র সংকটের পাশাপাশি বৈরি আবহাওয়ার কারণে খেতের ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে কৃষকরাও বাড়তি ভাড়া দিয়েই ধান কাটাই ও মাড়াই করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা অর্থের অভাবে সময়মতো ধান কাটতে না পেরে খেতের ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো চাষ মৌসুমে উপজেলায় ১৪ হাজার ১৮৬ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন। ধান কাটাই ও মাড়াইয়ের জন্য সরকারি প্রণোদনায় দেওয়া ৩৫টি কম্বাই হারভেস্টার মেশিন রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছে আরও শতাধিক হারভেস্টার। সবমিলিয়ে চলতি মৌসুমে ১৫০ টি কম্বাই হারভেস্টার মেশিন দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বোরো ধান কাটাই মাড়াইয়ের কাজ চলছে। কৃষিশ্রমিক দিয়ে ধান কাটলে বিঘাপ্রতি বিঘাপ্রতি ১০ টাকা আর কোথাও একর প্রতি ১৭-১৮ হাজার টাকা পড়ছে। তবে ফুলবাড়ীর প্রণোদনার কম্বাই হারভেস্টার মেশিনগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় প্রতি বছরই অন্য জেলা ও উপজেলা থেকে হারভেস্টার এসে ধান কাটাই মাড়াই করে থাকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতেতে নিচু খেতে পানি জলাবদ্ধতা আশঙ্কায় ফসল বাঁচাতে কৃষকরা দ্রুত ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপজেলার ৭নং শিবনগর ইউনিয়নের কয়রাকোল গ্রামের কৃষক বিনয় চন্দ্র রায় বলেন, তার ৭ বিঘা জমির ধান কাটাই ও মাড়াইয়ের জন্য কম্বাইÐ হারভেস্টার মেশিন মালিককে বিঘা প্রতি দূরত্ব অনুসারে ৪-৫ হাজার টাকা গুণতে হচ্ছে। এতে একর প্রতি ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পড়ে যাচ্ছে।
উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের বারাইহাট এলাকার কৃষক মো. মোরসালিন বলেন, ৫ হাজার টাকা চুক্তিতে ৪ বিঘা জমির ধান কাটতে হারভেস্টার মেশিন লাগিয়েছেন। এতে তার একর প্রতি পড়েছে ১৫ হাজার টাকা। অতিরিক্ত দামে ধান কাটাই মাড়াই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার দাম নির্ধারণ করেদিয়েছে কৃষকের স্বার্থে। কিন্তু মেশিন মালিকরা সেই দামে কাটছে না। সরকারি দামে ধান কাটার আশায় থাকলে খেতের ধান নষ্ট হয়ে যাবে এমন আশঙ্কায় টাকা না দেখে খেতের ধান ঘরে তোলা নিয়েই বেশি চিন্তা করেছেন।
একই এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, তার ৩ বিঘা জমিও বিঘাপ্রতি ৫ হাজার টাকা নিয়ে হারভেস্টার মেশিনে কাটাই মাড়াই করতে হয়েছে। এতে একর প্রতি ভাড়া পড়েছে ১৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, এ বছর একেই সার, বীজ, কীটনাশক ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান উৎপাদনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে, তার ওপর আবার বাড়তি ভাড়ায় ধান কাটা নিয়ে বিড়ম্বনা। বিড়ম্বনার জন্য কৃষকরা চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।
ভোক্তভোগী কৃষক উপজেলার বাসুদেবপুর গ্রামের আমিনুল ইসলাম, বাদশা হোসেন,আমিনুল ইসলাম, মুক্তারপুরের আলম মাস্টার, কাজীহাল ইউপি’র আ.আলিম,পৌর শহরের হুসেন মিয়া বলেন, জমিতে লাগানো বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু খেতের ধান কাটার দাম নিয়ে পড়েছেন চরম বিড়ম্বনায়। সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যে হারভেস্টার মালিকরা ধান কাটছেন না বলে বাধ্য হয়ে তাদের চাহিদানুযায়ী দামে ধান কাটতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কম্বাই হারভেস্টার মালিক বলেন, বর্তমানে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খরচ বেড়েছে। একই সঙ্গে মেশিন চালাতে চালকসহ তিনজন শ্রমিকের কাজ করে। তাদের মজুরি দিতে হয়। মেশিনের খরচ আছে। সবমিলিয়ে সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যে ধান কাটলে মেশিন খারাপ হলে আর ভালো করার টাকা থাকবে না। এ জন্য নিরূপায় হয়েই একটু বাড়তি ভাড়া দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। তাছাড়া নিচু জলাবদ্ধতা জমিতে ধান কাটতে তেলের খরচ বেড়ে যায়।
এদিকে উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহানুর রহমান তার ফেসবুক পেইজে গত রবিবার (১০ মে) কম্বাই হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটাই মাড়াই সংক্রান্ত একটি সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, হারভেস্টার মেশিনে প্রতি একর ধান কাটাই মাড়াই ভাড়া দূরত্ব অনুযায়ী সাড়ে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। এর বেশি কেউ নিলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, একর প্রতি ধান কাটাই মাড়াইয়ের জন্য সাড়ে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বৈরী আবহাওয়া ও নিচু জমি প্লাবিত হওয়াতে কৃষকদের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে বেশি দামে ধান কাটানোর প্রতিযোগিতার জন্যই ভাড়া বেড়ে গেছে। তবে নির্ধারিত ভাড়ায় ধান কাটার বিষয়ে কৃষি বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে।