মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৬ অপরাহ্ন
চলতি বছরের ‘এল নিনো’ আবহাওয়াগত পরিস্থিতির সামগ্রিক শক্তির দিক থেকে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বের একজন শীর্ষ বিশেষজ্ঞ। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যাসহ অন্যান্য চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ‘এল নিনো’ বলা হয়, যা বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছর পরপর এই পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং তা প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের কোনো কোনো অংশে তীব্র খরা ও অন্য অংশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
আন্তঃসরকারি সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস’ -এর এল নিনো বিশেষজ্ঞ টিম স্টকডেল জানিয়েছেন, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে এবারের এল নিনো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেল একটি ‘চরম’ আবহাওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে টিম স্টকডেল বলেন, আমি মনে করি এটা বলা একদম সত্যি যে, আমরা এর আগে কখনো এমন শক্তিশালী এবং বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেলে এত সামঞ্জস্যপূর্ণ এল নিনোর পূর্বাভাস পাইনি। তিনি আরও যোগ করেন, এবারের ঘটনাটি যদি শেষ পর্যন্ত রেকর্ড ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তবে তা হবে খুব, খুব বড় একটি বিস্ময়।
যদিও এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির আসল রূপটি দেখা যায় আরও পরে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই এল নিনো যুক্ত হয়ে ২০২৩ সালকে রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম এবং ২০২৪ সালকে সর্বকালের সর্বোচ্চ উষ্ণতম বছরে পরিণত করেছিল।
বৈশ্বিক প্রভাব : বন্যা, খরা ও দাবানল
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা গত মাসেই এল নিনো সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, এটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতির মুখে জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা সংস্থাগুলো এর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জরুরি তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া : এল নিনোর বছরগুলোতে এশিয়ার অনেক অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক পরিস্থিতি ও খরা দেখা দেয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে ভারতসহ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে কৃষিকাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের কৃষি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন।
অস্ট্রেলিয়া : এল নিনোর কারণে অস্ট্রেলিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে, যা সেখানে তীব্র খরা, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আফ্রিকা : আফ্রিকার ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ অঞ্চলে এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত বাড়লেও দক্ষিণ, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক ও খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়।
দক্ষিণ আমেরিকা : উপকূলীয় পেরু ও ইকুয়েডরসহ পশ্চিম দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। এর বিপরীতে, উত্তর ব্রাজিলে দেখা দেবে শুষ্ক আবহাওয়া, যা আমাজন বনে দাবানলের বড় কারণ হতে পারে।