মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম
নড়াইলে শিশু ধর্ষণের পর হত্যা, অভিযুক্ত রবিউল আটক গোপালগঞ্জে অতিবৃষ্টিতে ঘরবাড়ি জলমগ্ন, ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দিল টুঙ্গিপাড়া পৌরসভা চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর ইন্তেকাল লক্ষ্মীপুরে তাহেরা ফুডকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা কালিগঞ্জে কিশোরীদের এসআরএইচআর জ্ঞান, নেতৃত্ব ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে সচেতনতামূলক কর্মশালা মানিকগঞ্জে ব্যবসায়ীর ওপর সন্ত্রাসী হামলা, অবস্থা সংকটাপন্ন সাহিত্যে বলতে কী বুঝি? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানবসভ্যতার জন্য হুমকি- অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী নতুন ভূমিকায় ফিরছেন জনপ্রিয় শিল্পী ও অভিনেতা তাহসান খান আন্দোলন চালিয়ে যাবে সিজেপি, প্রতিক্রিয়া দেখালেন মোদি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানবসভ্যতার জন্য হুমকি- অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগান্তকারী উদ্ভাবনগুলো মানবসভ্যতার সামনে প্রায়ই অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর ইউরোপজুড়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, একজন শ্রমিকের মূল্য কত? আগামী দিনে উৎপাদন কার্যক্রমে শ্রমিকের আবশ্যকতা থাকবে কি না? ছাপাখানা আবিষ্কারের পর প্রশ্ন উঠেছিল, সত্য-মিথ্যা, তথ্য-উপাত্ত ইত্যাদির নির্ধারক কে? আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরো বিশ্বকে এক জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, ঠিক কী কাজ করার জন্য এবং কী রূপে এবং কেন পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকতে হবে?

প্রযুক্তি কখনই শুধু একটি হাতিয়ার মাত্র নয়; এটি সমাজের দর্পণবিশেষ। মানবজাতির প্রয়োজনে প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয় এবং মানবকল্যাণেই তা ব্যবহৃত হয়। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো মানবজাতির উদ্ভাবিত এমন একটি প্রযুক্তি, যা গড়ে উঠেছে আমাদের নিজেদের শব্দ, ছবি ও যুক্তি থেকে। এটি জ্ঞান আহরণ করেছে মানবজাতির সমষ্টিগত নথিপত্র থেকে। আমরা যখন এআই প্রযুক্তির দিকে তাকাই, তখন আসলে নিজেদেরই একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিফলন দেখি। এআই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য আগামী দিনে কী পরিণতি ডেকে আনবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এআই নিয়ে সবচেয়ে যুক্তিসংগত আশাবাদ দেখা দিয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। এআই প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই চিকিৎসাক্ষেত্রে এমনসব সমস্যার সমাধান করেছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর চেষ্টা করেও সমাধান করতে পারেনি। প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠনের পূর্বাভাস দেওয়া, ডিএনএ ও জিনগত জটিলতা বিশ্লেষণ করা ইত্যাদি বিষয় এতদিন পর্যন্ত অত্যন্ত জটিল ছিল। গবেষকরা এখন গুরুত্বের সঙ্গে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় ক্যানসার শনাক্তকরণ, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার এবং বার্ধক্যের জৈবপ্রযুক্তি নিয়ে যুগান্তকারী অগ্রগতির কথা বলছেন। এর সামান্য অংশও যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী কয়েক দশকে মানুষের আয়ুষ্কাল ও সুস্থ জীবনকাল এমনভাবে বাড়তে পারে, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে ছিল কল্পনাতীত।

বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশের জন্য এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা-ভবিষ্যৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অপ্রতুল এবং উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা মূলত কয়েকটি শহরে কেন্দ্রীভূত। এআই এমন একটি ব্যবস্থা, যা একজন গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীকে এক্স-রে বিশ্লেষণ করা, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা শনাক্তকরণ কিংবা জ্বরের রোগীকে প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণে এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানে সহায়তা করতে পারে। এভাবেই এআই প্রযুক্তি চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত লাখো মানুষের উপকারে আসতে পারে, তাদের জীবন বাঁচাতে পারে। একই কথা শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কল্পনা করুন, বাংলার একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক দেশের প্রতিটি জেলার প্রতিটি শিশুর জন্য যে শিক্ষা প্রদান করেন, তিনিই আবার শহরে একই পদ্ধতিতে শিক্ষা দিতে পারেন না। গ্রামের বিদ্যালয় এবং ঢাকার অভিজাত একাডেমি কখনোই একই মানের শিক্ষক পায়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে শিক্ষক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের প্রত্যেক শিশুকে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে।

ভূমিব্যবস্থাপনা ও কৃষি খাতের জন্যও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে আবহাওয়া, বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা প্রদান সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তি কৃষককে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। কোন জমিতে কী ফসল চাষ করবেন, কখন করবেন এবং লবণাক্ত মাটি ও অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবেন-কৃষক এসব তথ্য এআইয়ের মাধ্যমে পেতে পারেন। যে দেশের অস্তিত্ব এবং টিকে থাকা সবসময়ই আবহাওয়াকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করেছে, সেই দেশের জন্য আরও নির্ভুল পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে এক আশীর্বাদ।

যদিও এ নতুন প্রযুক্তি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নাড়া দিচ্ছে এবং এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে; ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রতিটি যুগান্তকারী প্রযুক্তিই এমনসব উদ্ভাবনের জন্ম দিয়েছে, যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। যখন মোটরগাড়ির আবির্ভাব ঘটে, তখন যথার্থভাবেই ঘোড়ার গাড়ি শিল্পের অবসান ঘটবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল; কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি-মোটেল, মহাসড়কের পাশের রেস্তোরাঁ, শহরতলি, লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক কিংবা সেগুলোর মাধ্যমে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। কম্পিউটার যখন এলো, টাইপ রাইটার অচল হয়ে পড়ে। যারা টাইপিংয়ের কাজ করতেন, তারা কাজ হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন। কিন্তু টাইপ রাইটারের পরিবর্তে সফটওয়্যার, নকশা এবং ডিজিটাল সেবাকে কেন্দ্র করে এমনসব শিল্পের জন্ম হলো, যার কথা একজন টাইপিস্ট আগে কল্পনা করতে পারতেন না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিটি নতুন উদ্ভাবন দৃশ্যমান কিছু কর্মসংস্থান বিলোপ করে ঠিকই, কিন্তু এর বিপরীতে অসংখ্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

ঐতিহাসিকভাবে বাষ্পীয় ইঞ্জিন, ছাপাখানা এবং কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মতো মানবজাতির যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোর পরিপূর্ণতা অর্জন এবং বৈশ্বিক সভ্যতাকে বিকাশের ধারায় রূপান্তরিত করতে কয়েক দশক বা শতাব্দী লেগেছে। দীর্ঘ সময়ের উৎপাদন প্রক্রিয়া, হাতে-কলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এসব পরিবর্তন ধীরগতিতে এগিয়েছে। কিন্তু আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করছে। কারণ, এটি স্থির প্রযুক্তির মতো নয়; এআই একটি সক্রিয়, ক্রমাগত উন্নয়নশীল আবিষ্কারের ইঞ্জিন হিসাবে কাজ করে, যা ডিজিটাল গতিতে পরিচালিত হয়। এটি বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ এবং কয়েক সেকেন্ডে লাখ লাখ তথ্যগত চাহিদা পূরণ করছে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়কে সংকুচিত করেছে। এছাড়া ভবিষ্যতের উদ্ভাবনের দিগন্তকে নাটকীয়ভাবে ত্বরান্বিত করছে।

এআই প্রযুক্তির কিছু নেতিবাচক প্রভাব আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। এ প্রযুক্তির তাৎক্ষণিক হুমকি হচ্ছে কর্মসংস্থানের বাজার সংকুচিত হওয়া। অতীতের যন্ত্রগুলো মানুষের পেশিশক্তির বিকল্প হয়েছিল; কিন্তু এ প্রযুক্তি মানবজাতির প্রচলিত বিবেচনাবোধ এবং কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। তবে আশার কথা, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই প্রযুক্তি শুধু একতরফাভাবে কর্মসংস্থান সংকুচিত করবে না, ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করবে। এআই প্রযুক্তি মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। পরিশ্রমকে নিরাময় করবে।

একজন শিক্ষক হিসাবে একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে : চিন্তার সৃষ্টিশীলতার কাজটিকে অন্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া। যে শিক্ষার্থী একটি প্রবন্ধ লিখে দেওয়ার জন্য যন্ত্রের সাহায্য নেয়, সে শুধু পরীক্ষায় প্রতারণাই করে না, সে নিজেকেও প্রতারিত করে; কারণ চিন্তাশক্তির প্রয়োগ ছাড়া জ্ঞানার্জনের কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা জ্ঞান আত্মস্থ করার পরিবর্তে শুধু সহজে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় হতে পারে। শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চাবিমুখ হয়ে পড়তে পারে। ক্লাসে যে ছাত্রটি প্রথম হয় এবং যে ছাত্রটি সবচেয়ে দুর্বল, তারা যদি এআই-এর সহায়তা নিয়ে কোনো পাঠ্যক্রম তৈরি করে, তাহলে একইরকম নম্বর পাবে এবং একই স্তরে মূল্যায়িত হবে। অবশ্য অনেকেই বলছেন, ক্লাসে যে ছাত্রটি প্রথম এবং যে ছাত্রটি সবচেয়ে দুর্বল, তাদের প্রশ্ন করার কৌশল এবং মানের ভিন্নতা থাকবে। তাই এআই যখন পাঠ্যক্রম তৈরি করে দেবে, তার মানও ভিন্ন হবে।

এআই প্রযুক্তির ইচ্ছাকৃত অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যেই স্বয়ংক্রিয় ড্রোন এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। এটি এমন ব্যাপক নজরদারি করতে সক্ষম হয়েছে যে, মানুষের মুখ, গতিবিধি অনুসরণ করতে শুরু করেছে, যার কল্পনাও বিংশ শতাব্দীর কোনো গোপন পুলিশ করতে পারেনি। ‘পূর্বাভাসভিত্তিক পুলিশিং’ এমন এক অবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা ছিল একান্তই অকল্পনীয়।

এরপর রয়েছে পরিবেশগত প্রভাব। বৃহৎ এআই ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পরিচালনা করার জন্য বিপুল পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া ডেটা সেন্টারগুলোয়ও এরূপ পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব যখন পৃথিবী আরও গভীরভাবে অনুভব করছে, তখন এ প্রবণতা সেই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো-যখন এআই মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম হয়ে উঠবে, তখন কি তারা তাদের স্রষ্টার প্রতি অনুগত থাকবে? নাকি নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে এবং এমনভাবে মানুষের মেধাকে ব্যবহার করবে, যাতে মানুষ প্রযুক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে? শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষক এবং এ প্রযুক্তি নির্মাণকারী বিজ্ঞানীরাই সতর্ক করেছেন, পর্যাপ্ত উন্নত এআই প্রযুক্তির ক্ষতিকর নেতিবাচক প্রভাব থেকে আত্মরক্ষার মতো কিছু বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলতে হবে। এমনভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যা শুধু মানবকল্যাণে নিবেদিত হয়। কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে যেন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেকে এমন কথাও বলছেন, হয়তো কোনোদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতিকে দাসে পরিণত করবে।

প্রতিযোগিতার নিজস্ব একটি যুক্তি থাকে : যখন পিছিয়ে পড়ার ভয় অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়, তখন নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং সুপরিকল্পিত বিবেচনা বিলাসিতায় পরিণত হয়। প্রযুক্তি একসময় পৃথিবীকে যেমন চাঁদে অবতরণের গৌরব দিয়েছিল, তেমনই ‘পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের’ মতবাদও উপহার দিয়েছিল। এআই প্রতিযোগিতাও সম্ভবত একইভাবে দ্বিমুখী হবে। একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানকে দ্রুত এগিয়ে নেবে; অন্যদিকে অস্ত্র এবং নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত উন্নত করবে, যা পৃথিবীর জন্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এ প্রতিযোগিতা আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনে : আমাদের সবচেয়ে মেধাবী মানুষ কি এ অগ্রগতির অংশ হয়ে দেশের জন্য অসীম সম্ভাবনার দ্বার খুলবেন, নাকি আমরা কেবল পাশ থেকে এ প্রতিযোগিতা দেখেই যাব?

এআই অনেক সময় বিভ্রান্তিকর বা ভুল তথ্য প্রদান করে। কাজেই যাচাই না করে কোনো তথ্য হুবহু ব্যবহার করা যুক্তিসংগত নয়। এআই প্রযুক্তির সামান্য ভুল ব্যবহার মানবজাতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে এর কাছ থেকে প্রাপ্ত সামরিক তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সৃষ্টি, মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি নয়। সৃষ্টি কখনো স্রষ্টার চেয়ে বড় হতে পারে না। মানুষ যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করবে, প্রযুক্তি সেভাবেই ফল দেবে। প্রযুক্তি নিজে নিজে কিছু করতে পারে না। তাকে পরিচালনা করে যে মানুষ, তার ওপর নির্ভর করবে কোন প্রযুক্তি মানবকল্যাণ সাধন করবে এবং কোনটি মানবসভ্যতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আশাহত হওয়ার কিছু নেই। যারা এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, তারাই আবার এমন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবেন, যা এর অপব্যবহার রোধ করতে সহায়তা করবে। এআই প্রযুক্তি কোন কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে, তা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। এতে এর অপব্যবহার রোধ করা যাবে। এ কথা সত্য, বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ; মানুষকে করেছে যান্ত্রিক। কিন্তু আমাদের সম্পূর্ণ আবেগবিবর্জিত হলে চলবে না। মানবকল্যাণে আমাদের আবেগকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

 


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: