বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:২৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
কুষ্টিয়ায় সাব রেজিস্ট্রার হত্যা মামলায় ৪ আসামির ফাঁসি ও ১ জনের যাবজ্জীবন মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বাইসাইকেল বিতরণ করেন বিশ্বে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছাড়াল ২৩ কোটি বিশ্বনেতাদের সামনে যে ৩ প্রস্তাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী মনে হচ্ছে আমি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ দাঁড়াবে না : পাপন পলাশের জিনারদীতে প্রফেসর কামরুল ইসলাম গাজীর উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত বরগুনার তালতলীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ, যুবক কারাগারে প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘের এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার প্রদান পূর্ণিমা ভক্তদের জন্য সুখবর ভালোবাসা ও লড়াইয়ের নতুন বার্তা দিলেন নুসরাত

আত্মবিশ্বাসহীনতা ও নেতিবাচকতার চার গল্প

নিউজ ডেস্ক :: কথায় বলে, ‘বনের বাঘে খায় না মনের বাঘে খায়।’ মনের বাঘে যে কিভাবে খায় বাংলার প্রাচীন উপকথাই হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আত্মবিশ্বাস না থাকা, নেতিবাচকতা এবং কাজ না করে সহজে কিছু পাওয়া নিয়ে প্রচলিত চারটি গল্প এখানে তুলে ধরা হলো।

গল্প-১
জঙ্গলের মাঝে গভীর তপস্যায় নিমগ্ন এক যুবক। একাগ্রচিত্তে সে ধ্যান করে যাচ্ছে। ঈশ্বরের সন্তুষ্টি লাভে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে সে। বৈষয়িক কোনো ব্যাপারেই এখন তার আর কোনো আগ্রহ নেই। জঙ্গলে হিংস্র প্রাণীর কোনো অভাব না থাকলেও তার ভয়ডর বলে কোন কিছু ছিল না। সাধনার ফলে এই যুবক একদিন ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করে। ঈশ্বর তাকে বর দেন, ‘তুমি যা ভাববে, তা-ই হবে।’

ঈশ্বরের বর পেয়ে যুবক আত্মহারা। ভাবল এই গহীন জঙ্গলে সোনার এক বিশাল প্রাসাদ হলে কেমন হয়। সাথে সাথে হলোও তা-ই। আনন্দে লাফিয়ে উঠল সে। হঠাৎ মনে হলো ক্ষুধা লেগেছে তার। ভাবল সোনার থালায় সব সুস্বাদু খাবারের কথা। সাথে সাথে সামনে হাজির। মজাদার সব খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলল সে। শরীর এখন একটু বিশ্রাম চাচ্ছে। সোনার পালঙ্কে গা এলিয়ে দিল।

হঠাৎ তার মনে হলো প্রাসাদের মাঝে থাকলেও এর চারপাশে রয়েছে গহীন জঙ্গল। এখন যদি একটা বিরাট বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলে! আর যায় কোথায়! যেই মনে করা ওমনি এক বিরাট বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলল। সোনার প্রাসাদে পড়ে রইল শুধু তার কয়েক টুকরো হাড়।

এ যুবক বছরের পর বছর জঙ্গলে কাটিয়েছিল, বাঘ তার ধারেকাছেও আসেনি। কিন্তু নিরাপদ সোনার প্রাসাদে সে মনের বাঘ থেকে রেহাই পেল না।

গল্পটি থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই, তাহলো কথা শুধু বাস্তবতার বিবরণই দেয় না, বাস্তবতা সৃষ্টিও করে। এক অনন্যসাধারণ দক্ষতা ও সম্ভাবনার উৎস হলো মানবমস্তিষ্ক। আর এ মস্তিষ্ককে চালায় মন। কাজেই মস্তিষ্কের ক্ষমতাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্যে প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

আপনি কি আত্মবিশ্বাসী? আপনার যা আছে তা নিয়ে কি আপনি কৃতজ্ঞ? আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কি আশাবাদী?

যদি না হয়, তাহলে আপনাকে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ইতিবাচক চিন্তা করুন। এখন থেকে আপনি প্রতিনিয়ত কি শব্দ ব্যবহার করছেন সে ব্যাপারে সচেতন হোন।

আপনি কি ভাবেন, কি বলেন, আর আপনাকে কি বলা হয় তা বিশ্লেষণ করুন। আপনার কথাবার্তা থেকে সকল নেতিবাচক শব্দ ও বাক্য বাদ দিন। কোনো নেতিবাচক শব্দ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলে সাথে সাথে ‘তওবা তওবা’ বা ‘বাতিল বাতিল’ বলুন। নেতিবাচক শব্দটিকে বাতিল করে দিন।

গল্প-২
এক এলাকায় প্রবল বন্যায় ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, মানুষ সব ভেসে যাচ্ছে। এসময় একজন লোক সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে লাগল, হে আমার সৃষ্টিকর্তার তুমি আমাকে উদ্ধার কর। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেল একটি নৌকা আসছে এদিকে।

মাঝি লোকটিকে নৌকায় উঠে আসতে বলল। কিন্তু সে রাজী হলো না। বলল, নৌকার দরকার নেই। আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে উদ্ধার করবেন। নৌকা চলে গেল। পানি আরো বাড়তে লাগল। তার ঘরের অর্ধেকরও বেশি অংশ ডুবে গেল। সে ঘরের মধ্যে চৌকি দিয়ে মাচা করে তার ওপর উঠে দাঁড়াল।

এর মধ্যে সেনাবাহিনীর পেট্রোল বোট অর্থাৎ স্পীডবোট যখন এদিক দিয়ে যাচ্ছিল তাকে দেখল এবং বলল, উঠে এসো। আমরা বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার করছি। সে তাদেরকেও বিদায় করে দিল এই বলে যে, আমি আপনাদের সাথে যাব না। আমার সৃষ্টিকর্তাই আমাকে উদ্ধার করবেন। স্পীডবোট চলে গেল।

এবার পানি বেড়ে তার ঘরের চাল পর্যন্ত উঠে গেল। সে গিয়ে দাঁড়াল চালের ওপর। এমন সময় ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার তাকে দেখতে পেয়ে সাথে সাথে রশি ফেলে বলল, এই রশি ধর। আমরা তোমাকে উঠিয়ে নিচ্ছি। সে বলল, আমি রশি ধরব না, সৃষ্টিকর্তাই আমাকে উদ্ধার করবেন।

পানি আরও বাড়ল এবং পানিতে ডুবে সে শেষ পর্যন্ত মারাই গেল। মারা যাওয়ার পর সে জানতে চাইলো, আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে এত ডাকলাম, অথচ তিনি আমার কথা শুনলেন না। কেনো?

তাকে বলা হলো, সৃষ্টিকর্তা তো তোমার কাছে প্রথমে ডিঙি নৌকা পাঠালেন, তারপর স্পীড বোট পাঠালেন, তারপর হেলিকপ্টার পাঠালেন। তারপরও তুমি যদি তাতে না ওঠ তাহলে সৃষ্টিকর্তা তোমাকে কীভাবে রক্ষা করবেন? কীভাবে বাঁচাবেন?

আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ভাবে অমুকে তাকে সাহায্য করবে। অথবা কাজ না করেও আশা করে যে তাকে সৃষ্টিকর্তা সাহায্য করবেন। বা তারা তাদের ব্যর্থতার জন্যে বাহ্যিক অবস্থাকে দায়ী করে। কিন্তু সফল মানুষেরা তাদের নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা নেয় এবং অবস্থা বদলাবার জন্যে নিজেরা উদ্যোগ নেয়, কাজে নেমে পড়ে।

গল্প-৩
এক পাহাড়ি গ্রাম। সেই গ্রামে এক প্রতারক ঢুকল। সে ছোটখাটো প্রতারণা করছে সফলভাবে। কিন্তু ‘ঐ যে চোরের দশদিন গৃহস্থের একদিন’। একদিন প্রতারকের প্রতারণা ফাঁস হয়ে গেল। গ্রামবাসীরা ধরে ফেলল তাকে। কিন্তু সকালবেলা কাজে যাওয়ার সময় হওয়ায় তারা ঠিক করল আপাতত জঙ্গলে গাছের সাথে তাকে বেঁধে রাখা হোক। সন্ধ্যার সময় এসে পাহাড় থেকে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হবে, যাতে এই আপদ থেকে সবসময়ের জন্যে মুক্ত থাকা যায়। গ্রামবাসীরা প্রতারককে বেঁধে রেখে চলে গেল।

এর মধ্যে এক রাখাল মেষ চরাতে চরাতে ওখানে চলে এল। রাখাল ছিল সহজ-সরল এক যুবক। সে প্রতারককে ওই অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করল, তোমার এ অবস্থা কেন? প্রতারক তার কথা শুনেই বুঝল যে, এ লোক এই গ্রামের নয়। সে সাথে সাথে ফন্দি বের করে ফেলল।

সে বলল- ‘আমার দুঃখের কথা তুমি শুনে কী করবে? আমার অনেক দুঃখ! রাখাল বলল- কী দুঃখ? প্রতারক বলে দেখ, আমি একজন সাধক মানুষ, সাধনা করতে চাই। পরম প্রভু ছাড়া আর কোনো কিছু আমি পেতে চাই না। আমি ঘর-সংসার করতে চাই না। কিন্তু এই গ্রামের লোকজন আমাকেই ধরেছে যে, সর্দারের মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। কারণ, এই গ্রামে সর্দারের মেয়েকে বিয়ে করার মতো আর কোনো পুরুষ নাই, আর তাকে আজকে সন্ধ্যার মধ্যেই বিয়ে দিতে হবে। নইলে মেয়েটি বাঁচবে না। এখন আমাকে সবাই ধরেছে যে, মেয়েটিকে বিয়ে করতে হবে। সেই সাথে সর্দারের যে সম্পত্তি, তার অর্ধেক আমাকেই নিতে হবে।

এখন বল, আমি একজন সন্ন্যাসী, গৃহত্যাগী মানুষ, প্রভু ছাড়া আর কোনো কিছু বুঝি না। আমাকে এখন এই কাজ করতে হবে! আমার ওপর এই জুলুম করা হচ্ছে! শুনতে শুনতে রাখাল ছেলেটি লোভাতুর হয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করল, আমার সাথে কি বিয়ে দেবে? প্রতারক বলল, ছেলে পেলেই বিয়ে দেবে। কারণ এ গ্রামে আর কোনো ছেলে নেই।

রাখাল তখন বলল, তোমার ওপর এই জুলুম দেখে আমার খুব মায়া হচ্ছে। তুমি তো সন্ন্যাসী, তোমার বিয়ের দরকার নেই। কিন্তু আমার তো বিয়ের দরকার আছে। এক কাজ করি। তোমাকে আমি খুলে দিচ্ছি। তুমি আমার এ ভেড়াগুলো নিয়ে চলে যাও। আর আমাকে এখানে বেঁধে রাখো যাতে সন্ধ্যার সময় তারা এখানে এসে আমাকে পায়।

প্রতারক বুঝল যে, শিকারি টোপ গিলে ফেলেছে। তবুও মুখ শুকনো করে বলল, তোমাকে আবার এই বিপদের মধ্যে ফেলব! সর্দারের মেয়ে দেখতে কেমন জানি না, মেজাজি কিনা তা-ও জানি না। কিন্তু যুবক তো তখন ভীষণ উত্তেজিত। বলে যে, আমি পুরুষ মানুষ, রাগী হয়েছে তাতে কী? রাগ আমি ঠিক করে ফেলব।

এ কথা বলে সে প্রতারকের বাঁধন খুলে দিল। প্রতারক তখন রাখালকে আচ্ছামতো বেঁধে ভেড়াগুলো নিয়ে সরে পড়ল। সন্ধ্যার সময় লোকজন মশাল জ্বালিয়ে এসেছে, পাহাড় থেকে প্রতারককে ফেলে দেবে বলে। রাখাল নানানভাবে প্রতিবাদ করতে চাইলেও কেউ তার কথা শুনল না। তারা ভাবল প্রতারক তো কত কথাই বলে!

কিন্তু পরদিন সকালবেলা গ্রামবাসী তো অবাক! প্রতারক ভেড়ার বিশাল পাল নিয়ে গ্রামের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রামবাসী বলল, এই তোমাকে না ফেলে দিয়েছিলাম সমুদ্রে! তুমি এখানে এলে কীভাবে?

প্রতারক তখন বলল, আর বলো না! তোমরা আমাকে ফেলেছিলে ঠিকই। কিন্তু এ সমুদ্রে আছে এক জ্বীনের বাদশার রাজত্ব। সে খুব দয়ালু। আমাকে ওখানে ফেলে দেয়ার সাথে সাথে সে আমাকে তুলে নিল। বলল যে, আমাদের এ রাজ্যে কারো মরার নিয়ম নেই। কেউ মরবে না। তুমি যেহেতু এসেই পড়েছ, এ রাজ্যের নিয়ম অনুসারে তোমাকে এই ১০০ ভেড়া দিয়ে দেয়া হলো। আমি ভেড়া নিয়ে চলে এলাম।

এখন গ্রামবাসী জিজ্ঞেস করল- ‘সমুদ্রে যে পড়বে তাকেই কী দেবে? প্রতারক বলল, হ্যাঁ। ওই রাজ্যের নিয়মই তাই। ব্যস, গ্রামের পুরুষরা সব বাড়ি-ঘর ক্ষেত-খামার গবাদি পশু ফেলে পাহাড় থেকে লাফিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে লাগল। আর ওই প্রতারক গ্রামের জায়গা-জমি-সম্পত্তি সবকিছুর মালিক বনে গেল।

সুতরাং সহজে পাওয়ার প্রত্যাশা করবেন না। আর পরিশ্রম ছাড়া যা পাওয়া যায় তা কখনো নির্ভেজাল হয় না। এমনকি ঘটনাচক্রে আপনি যদি পেয়েও যান আপনি তা ধরে রাখতে পারবেন না। সহজে বলা যায়, কাজ আর পরিশ্রমই মানুষকে উপরে উঠতে সহায়তা করে। অন্য কোন ভাবে নয়।

গল্প-৪
মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডবের একটি ঘটনা আছে। রাজ্য থেকে বহিষ্কৃত হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। বড়ভাই যুধিষ্ঠির তেষ্টা পেল। ছোটভাই গেলেন তার জন্যে পানি আনতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি হ্রদ দেখতে পেয়ে যে-ই না আঁজলা ভরে পানি নিতে গেলেন, অমনি দৈববাণী শুনলেন, থামো! পানি নেয়ার আগে তোমাকে একটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। আর জবাব দিতে না পারলে তোমাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

প্রশ্নটি হলো- জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য কী? ছোটভাই জবাব দিতে পারল না। সাথে সাথে মারা গেল। চতুর্থ, তৃতীয়, দ্বিতীয় ভাইও একে একে এল এবং জবাব দিতে না পেরে মৃত্যুমুখে পতিত হলো। সবশেষে এলেন যুধিষ্ঠির। এসে দেখলেন হ্রদের তীরে মৃত চার ভাইকে। দৈববাণী তাকেও একই প্রশ্ন করল। যুধিষ্ঠি জবাব দিলেন, ‘মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো মানুষ কখনো শিখতে চায় না।’ যুধিষ্ঠির জবাব সঠিক ছিল।

দৈববাণী তখন বলল, তুমি যা বলেছ তা ঠিক। আঁজলা ভরে পানি নিয়ে তোমার ভাইদের চোখে মুখে ছিটিয়ে দাও, তারা আবার প্রাণ ফিরে পাবে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ হলো যে তারা ভুল থেকে শেখে না। দৃষ্টিভঙ্গি বদলায় না। স্বভাব বা কৌশলের যে ত্রুটির কারণে সে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে, সেগুলোকে শোধরাবার কোনো উদ্যোগ তার থাকে না।
এএইচ/এসএ/

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি