মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৪ অপরাহ্ন
সাহিত্য (Literature) মানব ও সমাজজীবনের দর্পণ বা প্রতিচ্ছবি। মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, সংগ্রাম এবং শাশ্বত অনুভূতির শিল্পসম্মত প্রকাশই সাহিত্য। মানুষের জীবন, সমাজ ও সভ্যতার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সাহিত্যের বিকাশ ঘটে।
ইংরেজি Literature শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা ‘সাহিত্য’ শব্দটি ব্যবহার করি। তবে Literature শব্দটির ব্যাপক অর্থ রয়েছে। এর মাধ্যমে সব ধরনের লিখিত ও মুদ্রিত রচনা—যেমন রেলগাইড, রান্নার বই, পঞ্জিকা, আইনগ্রন্থ কিংবা বিভিন্ন নির্দেশিকাও বোঝানো হয়। কিন্তু সাহিত্য বলতে মূলত সেইসব সৃজনশীল রচনাকেই বোঝায়, যা জীবনপ্রবাহের বিচিত্র ও জটিল অভিজ্ঞতাকে শিল্পরূপে প্রকাশ করে।
এই সৃজনশীল সাহিত্যকে সাধারণ Literature থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে সমালোচক টি. এস. এলিয়ট (T. S. Eliot) Autoletic শব্দটি ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, সাহিত্য কেবল অর্থ প্রকাশের বিষয় নয়; এটি ভাষা, ভাব ও শিল্পরূপে একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টির নাম। একই ভাবনা প্রকাশ করেছেন মার্কিন কবি আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে— “A poem should not mean, but be.” অর্থাৎ প্রকৃত সাহিত্য তখনই সৃষ্টি হয়, যখন ভাষার সৌন্দর্য, আবেগ ও শিল্পরস শব্দের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
‘সাহিত্য’ শব্দটি বাংলা ‘সহিত’ শব্দ থেকে উৎপন্ন। ‘সহিত’ শব্দের সঙ্গে ‘য’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘সাহিত্য’ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। সহিত শব্দের অর্থ—সংযুক্ত, সমন্বিত, সঙ্গে, মিলন বা যোগ। তাই সাহিত্য শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো—মিলন, সংযোগ বা এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযুক্তি। আবার এটি জ্ঞানগর্ভ, শিক্ষামূলক এবং কাব্য, উপন্যাসসহ রসাত্মক সৃজনশীল রচনাকেও নির্দেশ করে।
লেখক তাঁর ভাষার শিল্পসৌন্দর্যের মাধ্যমে পাঠকের হৃদয়ের সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেন। সাহিত্যে বর্ণিত চরিত্রের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও জীবনসংগ্রামের সঙ্গে পাঠক নিজেকে একাত্ম করে অনুভব করেন। এ কারণেই সাহিত্যের মূল শক্তি মানুষের হৃদয়ের মিলনে।
প্রাচ্যের সাহিত্যসমালোচক শ্রীশচন্দ্র দাস তাঁর সাহিত্য সন্দর্শন গ্রন্থে বলেছেন—
“নিজের কথা, পরের কথা বা বাহ্যজগতের কথা সাহিত্যিকের মনোবীণায় যে সুরে ঝংকৃত হয়, তাহার শিল্পসংগত প্রকাশই সাহিত্য।”
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন—
“অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের এবং ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।”
সাহিত্যের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে উচ্চারিত স্রষ্টার বাণী, ধর্মগ্রন্থের শিক্ষা এবং মনীষী ও মহামানবদের কল্যাণমূলক চিন্তাধারাও সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে ড. লুৎফর রহমান বলেছেন—
“জীবনের কল্যাণের জন্য, মানুষের সুখের জন্য এ জগতে যিনি যত কথা বলিয়া থাকেন, তাহাই সাহিত্য।”
সাহিত্যের প্রাচীনতম ও আদি শিল্পরূপ হলো কবিতা। মানবসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন, অনুভূতি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় কবিতার পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভ্রমণসাহিত্য, রম্যরচনাসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা। আজও সাহিত্য সৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, সাহিত্য মানুষের মনন, বিবেক, অনুভূতি ও নান্দনিক চেতনার বিকাশ ঘটায়। তাই রুচিশীল, জীবনঘনিষ্ঠ ও মানবকল্যাণমুখী সুসাহিত্যের বিকাশই আমাদের কাম্য। এর মাধ্যমে অপসাহিত্য, বাণিজ্যিকতা ও কৃত্রিমতার প্রভাব থেকে সাহিত্য রক্ষা পাবে এবং মানুষের চিত্তের বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ ও সৌন্দর্যবোধ সমৃদ্ধ হবে।