বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান নতুন চুক্তি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির চেয়েও ভালো হবে। ওই চুক্তি ২০১৮ সালে তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহার করে নেয়।
মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দেন, যা আগের দিন শেষ হওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
তবে ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র বেসামরিক উদ্দেশ্যে, যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়াম ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য এটি প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হয়।
ইউরেনিয়াম কী এবং কোন দেশগুলোতে পাওয়া যায়?
ইউরেনিয়াম একটি ঘন ও তেজস্ক্রিয় ধাতু, যা পারমাণবিক চুল্লি ও অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি স্বাভাবিকভাবে কম ঘনত্বে শিলা, মাটি এবং এমনকি সমুদ্রের পানিতেও পাওয়া যায়।
বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ইউরেনিয়াম উৎপাদিত হয় মাত্র পাঁচটি দেশে—কাজাখস্তান, কানাডা, নামিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও উজবেকিস্তান। এছাড়াও বিশ্বের আরও কিছু দেশে ইউরেনিয়ামের মজুত পাওয়া গেছে।
ইউরেনিয়াম সাধারণত খনি থেকে উত্তোলন করা হয় অথবা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলা থেকে পৃথক করা হয়।
পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের আগে ইউরেনিয়াম কয়েকটি ধাপে প্রক্রিয়াজাত হয়:
—ইয়েলোকেক: খনন করা আকরিক রাসায়নিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়ে গুঁড়ো আকারে রূপ নেয়, যাকে ইয়েলোকেক বলা হয়।
—ইউরেনিয়াম টেট্রাফ্লুরাইড: ইয়েলোকেককে হাইড্রোজেন ফ্লুরাইড গ্যাস দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে সবুজ স্ফটিকে রূপান্তর করা হয়।
—ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড: আরও ফ্লুরিন যুক্ত করে সাদা স্ফটিক তৈরি করা হয়, যা সামান্য উত্তাপে গ্যাসে পরিণত হয়।
—ইউরেনিয়াম ডাইঅক্সাইড: গ্যাস সেন্ট্রিফিউজে ঘুরিয়ে কালো গুঁড়ো তৈরি করা হয়।
—জ্বালানি পেলেট: শেষে এটি চাপে ছোট ছোট সিরামিক পেলেটে রূপান্তরিত হয়, যা চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কীভাবে হয়?
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে তিনটি আইসোটোপ থাকে। এগুলো একই মৌল হলেও নিউট্রনের সংখ্যায় পার্থক্য থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৯৯.৩ শতাংশ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮, যা তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয়। প্রায় ০.৭ শতাংশ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৫, যা শক্তিশালী পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম। খুব সামান্য পরিমাণে ইউরেনিয়াম-২৩৪ থাকে।
শক্তি উৎপাদন বা অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম-২৩৫ আলাদা করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বলা হয়।
এই প্রক্রিয়ার জন্য প্রথমে ইউরেনিয়ামকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়, যাকে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড বলা হয়। এরপর এটি দ্রুত ঘূর্ণায়মান সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রে প্রবেশ করানো হয়, যা প্রতি সেকেন্ডে হাজারেরও বেশি ঘূর্ণন সম্পন্ন করতে পারে।
ঘূর্ণনের ফলে ভারি ইউরেনিয়াম-২৩৮ বাইরের দিকে সরে যায় এবং হালকা ইউরেনিয়াম-২৩৫ কেন্দ্রে জমা হয়। একবারে খুব সামান্য পৃথকীকরণ হয়, তাই এই প্রক্রিয়া একাধিক সেন্ট্রিফিউজে ধাপে ধাপে চালানো হয়, যাকে ক্যাসকেড বলা হয়।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিভিন্ন স্তর
সমৃদ্ধকরণের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার নির্ধারিত হয়:
—২০ শতাংশের নিচে: নিম্ন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম
—৩ থেকে ৫ শতাংশ: বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি
—৫ থেকে ১৯.৯ শতাংশ: আধুনিক চুল্লি ও গবেষণায় ব্যবহার
—২০ থেকে ৮৫ শতাংশ: গবেষণা ও বিশেষ প্রয়োগ
—৯০ শতাংশের বেশি: অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়াম
—৯৩ থেকে ৯৭ শতাংশ: নৌবাহিনীর সাবমেরিন ও বিমানবাহী রণতরীতে ব্যবহৃত
—০.৩ শতাংশের নিচে: ডিপ্লিটেড ইউরেনিয়াম, যা প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত হয়
কত সময় লাগে সমৃদ্ধকরণে?
সমৃদ্ধকরণের প্রক্রিয়া সরলরৈখিক নয়। অর্থাৎ ০.৭ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে যাওয়া যত কঠিন, ২০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে যাওয়া ততটা কঠিন নয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা তাত্ত্বিকভাবে আরও পরিশোধন করলে ১০ থেকে ১১টি স্বল্প প্রযুক্তির পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানী টেড পোস্টল বলেন, ইরানের বিদ্যমান সেন্ট্রিফিউজ সক্ষমতা দিয়ে বছরে প্রায় ৯০০ থেকে ১০০০ পৃথকীকরণ ইউনিট তৈরি করা সম্ভব।
তার হিসাব অনুযায়ী, ০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে প্রায় পাঁচ বছর এবং প্রায় ৫০০০ ইউনিট সময় লাগে। কিন্তু ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে যেতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ, প্রায় চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ লাগতে পারে।
উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর শেষ ধাপটি তুলনামূলকভাবে খুব দ্রুত সম্পন্ন হয় বলেও জানান তিনি।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বাস্তব সক্ষমতা
পোস্টল বলেন, ইরানের সেন্ট্রিফিউজ ব্যবস্থা ভূগর্ভে লুকানো থাকায় সামরিক হামলা দিয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, খুব ছোট জায়গায়ও সমৃদ্ধকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব, এমনকি একটি ছোট গাড়ির সমান বিদ্যুৎ উৎস দিয়েও একাধিক ক্যাসকেড চালানো যায়।
তার মতে, এর ফলে ইরান প্রয়োজন হলে দ্রুত অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়াম তৈরি করতে সক্ষম অবস্থায় থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইন
১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী দেশগুলো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে, তবে কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারির অধীনে।
এই চুক্তির অধীনে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো অস্ত্র হস্তান্তর করতে পারে না, এবং অ-অস্ত্রধারী দেশগুলোকে অস্ত্র তৈরির সুযোগ নিতে নিষেধ করা হয়।
বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল, দক্ষিণ সুদান ও উত্তর কোরিয়া এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী নয়।
২০১৫ সালের চুক্তি ও বর্তমান অবস্থা
২০১৫ সালে ইরান ও ছয় বিশ্বশক্তির মধ্যে একটি পারমাণবিক চুক্তি হয়, যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশে সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল।
তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বলেছিল, ইরান চুক্তি মেনে চলছিল এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে ছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। পরে ২০২০ সালে ইরান জানায়, তারা আর নির্ধারিত সীমা মানবে না।
এরপর ইরান পুনরায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
বর্তমান আলোচনায় ইরান জানিয়েছে, তারা ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম কমিয়ে ২০ শতাংশে নামাতে রাজি, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র পরিস্থিতি
বর্তমানে প্রায় নয়টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক, যাদের কাছে মোট প্রায় ১২ হাজারের বেশি ওয়ারহেড রয়েছে।
এর মধ্যে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে। কয়েকটি দেশ তাদের অস্ত্র আধুনিকায়ন করছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা একমাত্র দেশ, যারা স্বেচ্ছায় তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করেছে।
ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো তা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।
সূত্র: আল-জাজিরা