বুধবার, ০৪ অগাস্ট ২০২১, ০৩:৫৬ অপরাহ্ন

মাত্র ২৩৭ টাকার জন্য হাত পাতেন ইরফান!

ভুগছিলেন মস্তিষ্কের এক বিশেষ ধরনের ক্যানসারে। শেষমেশ লড়াইটাতে হেরেই গেলেন ইরফান খান। বুধবার সকালে মুম্বইয়ের কোকিলাবেন হাসপাতালে মৃত্যু হয় ৫৩ বছর বয়সি এই অভিনেতার। মাত্র চার দিন আগেই জয়পুরে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর মায়ের।

ব্রেন টিউমার নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে লড়াই করছিলেন তিনি। সুস্থ হয়ে ‘আংরেজি মিডিয়াম’ ছবির মধ্যে দিয়ে কামব্যাকও করেছিলেন। দু’বছর ধরে তিনি মারণরোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছেন। অথচ তাঁকে দেখে বোঝার উপায়ই ছিল না যে, কতটা যন্ত্রণা সহ্য করে অভিনয় চালাচ্ছিলেন তিনি। এতটাই ছিল অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা।

এহেন এক জন কিংবদন্তি অভিনেতার অভিনয় জীবনটা শুরু হয়েছিল অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে। মাত্র ২৩৭ টাকার জন্যও এক বার হাত পাততে হয়েছিল তাঁকে!

ইরফান খান ১৯৬৭-র ৭ জানুয়ারি ভারতের জয়পুরে একটি মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইরফানের মা ছিলেন বেগম খান এবং তাঁর বাবা ছিলেন জাগিরদার খান। টঙ্ক জেলার বাসিন্দা। তিনি টায়ারের ব্যবসা করতেন। ছোট থেকেই ইরফানের নেশা ছিল ক্রিকেট। কিন্তু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটকে ছাপিয়ে হৃদয় জয় করে নেয় অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা।

স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা চলাকালীন সময়েই ১৯৮৪তে ইরফানের কাছে আসে এক সুবর্ণ সুযোগ। তিনি দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপ-সহ সুযোগ পেয়ে যান। সেখান থেকে তিনি ড্রামাটিক আর্টসে ডিপ্লোমা করেন।

শোনা যায়, এখানে ভর্তির জন্য টাকা যোগার করার পরেও তাঁর দরকার ছিল ২৩৭ টাকা। সে সময় ইরফানের বাবার মৃত্যু হয়েছিল। পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছিলেন তাঁর দাদা। প্রথমে দাদার কাছেই টাকাটা চেয়েছিলেন। কিন্তু দাদা তাঁকে সাহায্য করেননি। তার পর ছোটবেলার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়ি গিয়ে হাজির হন ইরফান। কিন্তু সেই বন্ধুও তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আর ক’দিন আগে এলে তাঁর কাছে টাকা ছিল, এখন আর নেই। বন্ধুর এই উত্তরে কষ্ট পেয়েছিলেন ইরফান।

শেষে টাকার ব্যবস্থা হয় যদিও। তাঁর বোন নিজের জমানো পুঁজি থেকে ইরফানকে সাহায্য করেছিলেন। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে পাশ করার পর ইরফান খান মুম্বইয়ে চলে আসেন। এখানে এসে তিনি টেলিভিশন সিরিয়াল দিয়ে নিজের কেরিয়ার শুরু করেন। যদিও প্রথম দিকে তাঁকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে কাজ পেতে। তিনি প্রথম দিকে পড়ানোর কাজও করেছিলেন।

একে একে অভিনয় করলেন ‘চাণক্য’, ‘ভারত এক খোঁজ’, ‘সারা যাঁহা হামারা’, ‘বানেগী আপনে বাত’, ‘চন্দ্রকান্ত’, ‘শ্রীকান্ত’। স্টারপ্লাসের ‘ডর’ নামক এক সিরিজের প্রধান ভিলেন ছিলেন ইরফান। এতে তিনি কে কে মেননের বিপরীতে এক সাইকো সিরিয়াল কিলারের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

১৯৮৮ সালে এসে তাঁর কেরিয়ার এক নতুন মোড় নেয়। পরিচালক মিরা নায়ার তাঁকে ‘সালাম বম্বে’তে একটি অতিথি চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, তার চরিত্রের অংশবিশেষ শেষ পর্যন্ত ফিল্মের এডিটিংয়ে বাদ চলে যায়। তবে এর পর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাননি ইরফান।৩৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি ৫০টির বেশি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-সহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।

চলচ্চিত্র সমালোচক, সমসাময়িক অভিনয়শিল্পী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা তাকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বলে গণ্য করেন। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করে। পেস্তা সবুজ রঙের জ্যাকেট ইরফান খানের বড়ই প্রিয় ছিল। ‘করীব করীব সিঙ্গল’ ছবিতে তা পরেওছিলেন। অ্যাম্বাসেডর গাড়িও ভালবাসতেন ইরফান। কিন্তু সেটা আর কিনে ওঠা হল না তাঁর।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি