শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০৭:১২ অপরাহ্ন

সমতলে কমছে চা উৎপাদন, দিশেহারা চাষি এম মোবারক হোসেন, পঞ্চগড়

দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়কে বলা হয় চা উৎপাদনে দ্বিতীয় অঞ্চল। বিগত কয়েক বছর রেকর্ড হারে উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এ জেলা। তবে বর্তমানে বিভিন্ন কারণে কমেছে চা উৎপাদন। কাঙ্ক্ষিত পাতা না পেয়ে দিশেহারা চা চাষিরা।

জানা গেছে, গাছের কুঁড়ি থেকে নতুন পাতা বের হতেই পচে যাচ্ছে। পাতায় পোকার আক্রমণ হচ্ছে। কীটনাশক ব্যবহারেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না পোকার আক্রমণ ও পচা রোগ নিয়ন্ত্রণ। বাগান বাঁচানোর লড়াইয়ে বিভিন্ন কীটনাশক ক্রয় ও শ্রমিক খরচে বাড়ছে উৎপাদন খরচও। পোকা ও পচা রোগের কারণে খরচ বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।

চাষিরা বলছেন, চলতি বছরে পঞ্চগড়ে প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত নেই। এবার প্রচণ্ড খরার প্রভাব পড়েছে চা শিল্পে। বাগানে লাল মাকড়, কারেন্ট পোকা ও লোফারের আক্রমণ বেশি থাকার কারণে কমেছে চা পাতার উৎপাদন। সংকটের মধ্যেই নতুন করে পাতাপচা রোগ যেন মরার ওপর খরার ঘা।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় চা বাগানে দেখা গেছে, প্রতিটি বাগানে পোকার আক্রমণ ও পাতা পচা রোগ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাতার উৎপাদন কমে যাওয়ায় কাঁচা পাতার সংকটে আছেু কারখানাগুলোও। অধিকাংশ কারখানা এক শিফট চালু রেখেছে। কেউ কেউ আবার একদিন পর পর বা সপ্তাহে মাত্র ২-৪ দিন কারখানা চালাচ্ছে। ফলে কারখানা মালিক থেকে শুরু করে শ্রমিকরা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তেঁতুলিয়ার নুরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল খালেক ও আহসান হাবীবসহ কয়েকজন চা চাষি জানান, চলতি মৌসুমে চা পাতার দাম ২৪-২৫ টাকা পর্যন্ত কারখানায় দিতে পারছি। যদিও মৌসুমের শুরুতে ১৫ থেকে ১৬ টাকা ছিল। পরে পাতার দাম বেড়েছে। এরপরও বিভিন্ন সমস্যার কারণে এ দামে আমাদের পোষাচ্ছে না। নতুন করে পাতাপচা রোগে বিপাকে পড়েছি। বাগান টিকিয়ে রাখতে সার-কীটনাশকসহ নানা ওষুধ প্রয়োগ করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

এদিকে, চা শিল্পের তৃতীয় অঞ্চল ও উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার পরেও চা চাষে আলাদাভাবে নেই সারের বরাদ্দ। চলতি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে পঞ্চগড়ে সারের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয় ইউরিয়া ৪৫ হাজার ৯শ ৮২ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৪ হাজার ৯শ ১৬, ডিএপি ১৭ হাজার ২শ ৪৫, এমওপি ২২ হাজার ৫শ ৪৬ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ১ হাজার মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেয় মন্ত্রনালয়। এই বরাদ্দের ভিত্তিতে ৫ উপজেলায় সার বিভাজন করা হয়। কিন্তু চা চাষে এ বরাদ্দে নেই।

চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের এ জেলায় নিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান রয়েছে ১ হাজার ৬৫টি, বড় চা বাগান রয়েছে ৮টি। অনিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে ৫ হাজার ৮৫৫, বড় চা বাগান রয়েছে ২০টি। জেলায় মোট নিবন্ধিত চা বাগান ১ হাজার ৪৭৩ ও অনিবন্ধিত চাবাগান রয়েছে ৫ হাজার ৮৭৫টি। ১০ হাজার ২৬৭.২৮ একর জমির বাগানে সবুজ চা পাতা উৎপাদিত হচ্ছে। বৃহৎ এ অঞ্চলে চা চাষের জন্য আলাদাভাবে সার বরাদ্দ না থাকায় বোরো-আমন বরাদ্দের সার ব্যবহার হয়। ফলে চা চাষিরা সার সংকটে ভোগেন। আরেকদিকে বোরো-আমনের বরাদ্দের সার চা বাগানে ব্যবহার হওয়ায় সার সংকটে ভুগছেন আমন-বোরো চাষিরা।

তেঁতুলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার তামান্না ফেরদৌস জানান, আগের মতোই সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। এবার চাহিদা অনুযায়ী বিভাজনও করা হয়েছে। কিন্তু চা-সহ বিভিন্ন আবাদের কারণে সারের সংকট দেখা দিতে পারে। আরও সারের প্রয়োজন রয়েছে।

চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফ খান বলেন, প্রচণ্ড খরা ও গরমের কারণে প্রথমে লাল মাকড়, পরে লোফারের আক্রমণ হয়। এগুলো দমনের পর শুরু হয়েছে পাতাপচা রোগ। আমরা চাষিদের কপার, হাইড্রোক্সাইড বা অক্সিক্লোরাইড জাতীয় ছত্রাকনাশক দুই দফায় স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছি। এতে আক্রান্ত বাগানে রোগ কমছে। কয়েক দিন আগে দৈনিক পাতা সংগ্রহ নেমে গিয়েছিল তিন লাখ কেজিতে, যা এখন বেড়ে পাঁচ লাখে দাঁড়িয়েছে। আশা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং এবার সমতলে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন হবে। আর সারের বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সারের চাহিদা বাণিজ্যমন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে থাকি। সেখান থেকে যা বরাদ্দ হয়ে আসে তা ডিলারের মাধ্যমে চাষিরা সংগ্রহ করে ব্যবহার করে থাকেন।

চা উৎপাদন কমে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর চা উৎপাদন কমে গিয়েছিল এটা সত্য। তবে এ বছর সরকারি রেকর্ডে বেড়েছে।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: