বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন
নোয়াখালী হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন বরই গাছের পরিচর্যার মৌসুম চলছে। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বরই গাছে নতুন কুঁড়ি ও ফুলের সমাহার দেখা দিতে শুরু করেছে। কৃষকরা বলছেন, এই ফুল ফোটার সময়টাই বরই চাষের সবচেয়ে সংবেদনশীল ধাপ; সামান্য অবহেলা হলে ফুল ঝরে যেতে পারে, যা পুরো ফসলের সাফল্যকে প্রভাবিত করে।
তমরদ্দি, সোনাদিয়া, জাহাজমারা, হরণী, চান্দদী ও নিঝুমদ্বীপের কৃষকরা এখন বরই চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বরই চাষে লাভজনক সম্ভাবনার কারণে স্থানীয় কৃষকরা উৎসাহিত হচ্ছেন, যা তাদের জন্য নতুন সমৃদ্ধির পথ তৈরি করছে। হাতিয়ার বিভিন্ন গ্রাম বুডিরচর, চরকিং, চরঈশ্বর ও সোনাদিয়া ইউনিয়নে দেখা গেছে, কৃষকরা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা ডাল ছাঁটাই, সার প্রয়োগ, সেচ, কীটনাশক স্প্রে এবং পোকামাকড় থেকে ফুল রক্ষায় পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
চরঈশ্বর ইউনিয়নের চরকৈলাশ গ্রামের চাষি আলাউদ্দিন ডুবাই বলেন, “এবার গাছে ফুল ভালো এসেছে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে বরইয়ের উৎপাদন খুব ভালো হবে। অন্যান্য ফসলের মতো বেশি খরচও লাগে না। যত্ন ঠিকমতো করতে পারলে এক মৌসুমেই লাভ পাওয়া যায়। বাজারেও দেশি, কুল, আপেল কুল, বাউ কুলের চাহিদা থাকায় বিক্রি নিয়েও দুশ্চিন্তা কম।”
তিনি আরও বলেন, সঠিক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে কৃষিতে আরও বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং স্থানীয় কৃষকরাও বেশি লাভবান হবেন। কয়েকদিন পর চারপাশের পানি শুকিয়ে গেলে বড় ধরনের পানি সংকট তৈরি হয়, যা ফসল উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই উপজেলা কৃষি অফিস ও পানি সম্পদ অধিদপ্তরের প্রতি তার আবেদন এলাকায় ‘মল পাম্প’ বসিয়ে সেচ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং বহু কৃষক উপকৃত হবেন।
চরঈশ্বর ইউনিয়নের খান সাব জানান, “ প্রতিদিন আমরা ফুল ও কুঁড়ি ধরে রাখার জন্য বিশেষ যত্ন নিচ্ছি। সামান্য ভুল হলেও ফুল ঝরে যাবে। তাই প্রতিদিন সবাই মিলে একযোগে কাজ করি।” চরঈশ্বর ইউনিয়নের চাষি রুবেল বলেন, “ বরই চাষে চ্যালেঞ্জ আছে, তবে প্রতিটি ধাপে যত্ন নেওয়াই মূল কাজ। বাজারে চাহিদা দেখে মনে হচ্ছে কঠোর পরিশ্রমের ফল আমরা পাবো।
চরকিং ইউনিয়নের শরীফ উদ্দিন বলেন, “ আমরা প্রতিদিন বাগানে কাজ করছি। কীটনাশক স্প্রে এবং সেচ ঠিকমতো করা হলে ফলন অবশ্যই ভালো হবে। বরই মৌসুমে কৃষকের কঠোর পরিশ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি।
চরঈশ্বর ইউনিয়নের কৃষক অলি উদ্দিন জানান, এক কানি জমিতে তিনি ১ হাজার ২০০টি বরই গাছের চারা রোপণ করেছেন। এতে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। তিনি বলেন, প্রথম বছরেই গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে উঠছে এবং উৎপাদনও আশাব্যঞ্জক। চলতি মৌসুমে তিনি কমপক্ষে আড়াই লাখ টাকার বরই বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। বুডিরচর ইউনিয়নের মালেক মিয়া ও তার ছেলে ছালা উদ্দিন মালেক বলেন, “বরই মৌসুম শুরু হওয়ায় হাতিয়ার বাজারও এখন সরগরম। বড় বড় পাইকাররা আগেই বাগান ঘুরে আগাম বুকিং দিয়ে যাচ্ছেন, যা কৃষকদের স্বস্তি দিচ্ছে।
একাধিক চাষি অভিযোগ করে জানান, তারা কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন না। তাদের দাবি ফসলের রোগবালাই, সার-বীজ সংকট, মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সময়ে কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি না থাকায় চাষাবাদে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তারা দ্রুত কার্যকর সহায়তা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন।
কৃষকদের অভিযোগ সময়মতো কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি না থাকায় ফসলের সমস্যা ও রোগবালাই নিরসনে তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। এতে ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষকের আয় হ্রাস পায়। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট বিভাগ চাইলে নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করে মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে। জরুরি পরামর্শের জন্য ফোন বা অনলাইন সেবা চালুকরলে কৃষকেরা দ্রুত সহযোগিতা পাবে।
হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল বাছেদ সবুজ বলেন, “বরই এখন হাতিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। প্রতি বছর নতুন নতুন কৃষক এতে যুক্ত হচ্ছেন। হাতিয়ায় ভল সুন্দরী, কাশ্মীরী ও ভারত সুন্দরী জাতের বরই ভালো চাষ হচ্ছে। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি, যাতে ফুল থেকে শতভাগ ফলন নিশ্চিত করা যায়। এবার হাতিয়ায় ২৮ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়েছে। প্রকৃতি সহায় হলে এ বছর উৎপাদন আরও বাড়বে।
বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে পরিচর্যা ও রোগবালাই দমন কার্যক্রম চলায় বরই উৎপাদন ভালো হওয়ার আশা করছেন কৃষকেরা। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় দিন দিন বরই চাষে কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি ও প্রশিক্ষণের ফলে কাশ্মীরী ও ভারত সুন্দরী জাতের বরইয়ের মান ও বাজার চাহিদা বেড়েছে। কৃষি বিভাগ মনে করছে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে হাতিয়ার বরই উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
পরিচর্যার ব্যস্ততার মাঝেও কৃষকদের চোখেমুখে ঝরে আশার আলো। বরই গাছের দোলানো ফুল যেন জানান দিচ্ছে হাতিয়ার কৃষকদের কঠোর পরিশ্রম এই মৌসুমে নতুন প্রাপ্তি ও সাফল্যের দুয়ার খুলে দেবে।