সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪২ পূর্বাহ্ন

জয়-পরাজয়ে নিয়ামক হতে পারে চা-শ্রমিক ও সনাতনীদের ভোট

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি :
ভোটারের নজর এখন হবিগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসনের দিকে। হবিগঞ্জ-৪ আসনে ভোটের মাঠে বিএনপি, বৃহত্তর সুন্নী ঐক্যজোট, জামায়াতসহ ৯ জন প্রার্থী থাকলেও শেষ মুহূর্তে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। বিজয় নিশ্চিত করতে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার শেষ পর্যায়েও চলছে গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও জমজমাট প্রচার। তবে শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ে নিয়ামক হতে পারে আসনটির সনাতনী ও চা-বাগানের শ্রমিকদের ভোট।

চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ২৪২, হবিগঞ্জ-৪। এ আসনে রয়েছে ২১টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪৭ জন। এর মধ্যে চুনারুঘাট উপজেলায় ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৮৪০ জন। এ আসনে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা সনাতনী হিন্দু ভোটারের চেয়ে বেশি। সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের ত্যাগী নেতা, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও শিল্পপতি আলহাজ সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল। অপরদিকে দেশব্যাপী আলোচিত ইসলামী বক্তা, বৃহত্তর সুন্নী ঐক্যজোটের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা গিয়াস উদ্দিন তাহেরী। এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা ও ১১ দলীয় জোটের দেয়ালঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী শিল্পপতি ড. আহমদ আব্দুল কাদের, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী (বিদ্রোহী), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের হারিকেন প্রতীকের প্রার্থী শাহ মো. আল আমিন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর মই প্রতীকের প্রার্থী মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের লাঠি প্রতীকের প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম খোকন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের সালেহ আহমদ সাজন এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আপেল প্রতীকের প্রার্থী রেজাউল মোস্তাফাসহ মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বদলে যাচ্ছে ভোটের সমীকরণ। প্রচারের শুরুতে এখানে ধানের শীষ অনেক এগিয়ে ছিল। তবে নানা কারণে সেই হিসাব এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধানের শীষ এখন মোমবাতির কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিএনপির ধানের শীষ ও বৃহত্তর সুন্নী ঐক্যজোটের মোমবাতির এই ভোটযুদ্ধ এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ে মূল ভূমিকা রাখবে সনাতনী ও চা-শ্রমিকদের ভোট। অধিকাংশ হিন্দু ও চা-শ্রমিকের ভোট যেদিকে যাবে, সেই প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে সচেতন মহলের ধারণা।

এদিকে এ অঞ্চলের ভোটাররা নির্বাচনী মাঠে যেসব দাবি তুলে ধরছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রেমা-কালেঙ্গা যাতায়াতে নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দলমত নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং হয়রানি ও দালালমুক্ত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি এসব জনদাবি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকবেন—এমনটাই প্রত্যাশা অবহেলিত এ জনপদের মানুষের।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ বাড়ছে। হবিগঞ্জের চারটি আসনের মধ্যে হবিগঞ্জ-৪ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও উত্তেজনা নিয়ে একের পর এক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে ধানের শীষ ও মোমবাতি। গত ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের ডামাডোল বেজে উঠতেই বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা প্রার্থীকে নিয়ে বিরামহীন প্রচার-প্রচারণায় নামেন। শহরসহ গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে নানা ধরনের ব্যানার টাঙানো হয়েছে।

বর্তমানে সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল (ধানের শীষ) ও মাওলানা গিয়াস উদ্দিন তাহেরী (মোমবাতি) এই দুই প্রার্থীকে ঘিরেই বেশি আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনা পুরো হবিগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। সমগ্র দেশের নজরও এখন এ আসনের দিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক দখল করে রেখেছেন ধানের শীষ ও মোমবাতির সমর্থকেরা। প্রচারের শেষ পর্যায়ে এসে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ড. আহমদ আব্দুল কাদেরের পক্ষে মাঠে কাজ করছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। সব মিলিয়ে হবিগঞ্জের চারটি আসনের মধ্যে হবিগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসনটি নিয়ে ভোটারদের আগ্রহের কমতি নেই।

এদিকে আওয়ামী ঘরানার ভোটার, বিশেষ করে চা-শ্রমিক ভোটারদের কাছে টানতে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। চা-বাগান, পাহাড় ও সীমান্তঘেঁষা হবিগঞ্জ-৪ আসনের বাগান এলাকার ভোটাররা কাকে ভোট দেবেন—এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন। এ আসনে মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলায় ছোট-বড় মোট ২২টি চা-বাগান রয়েছে। এসব বাগানে ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভোটার রয়েছেন। ভোটারদের অধিকাংশই নৌকার প্রতি ঐতিহ্যগতভাবে অনুগত। তবে প্রার্থীরা নানা কৌশলে চা-শ্রমিকদের ভোটকেন্দ্রমুখী করতে কাজ করছেন এবং নিজেদের কৌশল নির্ধারণে চিন্তাভাবনা করছেন।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: