মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন

বয়স চোরা – সাঈদুর রহমান লিটন

গল্প: বয়স চোরা

সাঈদুর রহমান লিটন

তানিয়া বাণিজ্য মেলায় বেড়াতে এসেছে। বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহে মেলাটি বসেছে, তাই অনেকে একে বৈশাখী মেলাও বলছে। বৈশাখ মাস বলে তানিয়াও বৈশাখী সাজে সেজেছে।

তানিয়ার সঙ্গে এসেছে আরেকজন মেয়ে। দু’জনই একই সাজে সজ্জিত—লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, মাথায় খোঁপা, কপালে মেরুন টিপ, চুলে বেলী ফুলের মালা। একেবারে খাঁটি বাঙালি সাজ। দু’জনকেই দারুণ লাগছে। তবে তানিয়ার সঙ্গে থাকা মেয়েটিকে যেন আরও বেশি সুন্দর লাগছে। সদা হাস্যময়ী, অনিন্দ্য সুন্দরী, যাকে প্রথম দেখাতেই যে কারও ভালো লেগে যাবে।

দু’জন সারাক্ষণ হাত ধরাধরি করে ঘুরছে, কখনো গলা জড়িয়ে হাঁটছে, কখনো উচ্চস্বরে হাসছে। গরমে শরবত খাচ্ছে, আবার যুবকদের দেখলে একটু আলাদা ভঙ্গিতে হাঁটছে। দেখে মনে হয়, তারা যেন প্রাণের বান্ধবী—যাদের মাঝে কোনো গোপনীয়তা নেই, নেই ছোট-বড় বা ধনী-গরিবের ভেদাভেদ।

মেলার মাঝখানে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছে লাল ফুলে ভরে আছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন লাল কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। গাছের নিচে কয়েকটি বেঞ্চ রাখা। কেউ বসে গল্প করছে। তানিয়ারা গিয়ে সেখানে বসল। সামনে একজন মাঠাওয়ালা কাকা মাঠা বিক্রি করছেন।

তানিয়া বলল,
— কাকা, দুই গ্লাস মাঠা দিন।

দু’জন খুব কাছাকাছি বসেছে। এমন সময় তানিয়ার বন্ধু অমিয় এসে বলল,
— হাই তানিয়া!

তানিয়া হেসে বলল,
— হাই, এখানে বসো।

অমিয় তানিয়ার সঙ্গে একই কলেজে মাস্টার্স করেছে। তানিয়া তার জন্য আরেক গ্লাস মাঠা আনালো। মাঠা খেতে খেতে অমিয় এক নজর তাকালো তানিয়ার সঙ্গের মেয়েটির দিকে। মেয়েটি মিষ্টি করে হেসে দিল। অমিয় একটু লজ্জা পেল।

এরই মধ্যে কৃষ্ণচূড়ার কয়েকটি পাপড়ি এসে তানিয়াদের চুলে আটকে গেছে। তাতে যেন তাদের সৌন্দর্য আরও বেড়ে গেছে।

অমিয় মনে মনে ভাবল, মেয়েটি হয়তো তানিয়ার বোন কিংবা বান্ধবী। দেখতে তো অসাধারণ!

মাঠা শেষ করে অমিয় বলল,
— চল, মিষ্টি খাই।

তানিয়া বলল,
— চল।

তারা মিষ্টির স্টলে গিয়ে বসল। অমিয় ইচ্ছে করেই মেয়েটির পাশে বসল। সবাই হাসতে হাসতে যার যার পছন্দের মিষ্টি খেল।

কিছুক্ষণ পর অমিয় বলল,
— তানিয়া, আমি উঠবো। একটা কথা ছিল… ইনার সঙ্গে তো পরিচয় করিয়ে দিলে না। আমিই করে নিচ্ছি। আমি অমিয় হাসান, তানিয়ার বন্ধু। সোনালী ব্যাংকে চাকরি করি।

তানিয়া কিছু বলতে যাবে, এমন সময় অমিয় আবার বলল,

— আমি সরাসরি কথা বলতে ভালোবাসি। আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। মা আমার জন্য মেয়ে খুঁজছেন। আমি মাকে বলব, আর খুঁজতে হবে না। আমি মেয়ে পেয়ে গেছি।

মেয়েটি হেসে বলল,

— তোমাকেও আমার খুব ভালো লেগেছে বাবা! আমিও তানিয়ার জন্য এমন একজন ছেলে খুঁজছি।

অমিয় যেন আকাশ থেকে পড়ল। মাথায় যেন সিস্টেম এরর!

মানে… যাকে এতক্ষণ তানিয়ার বান্ধবী ভেবে প্রেমে পড়ে যাচ্ছিল, তিনি আসলে তানিয়ার মা!

তানিয়ার মায়ের বয়স যেন তানিয়ার চেয়েও কম দেখায়। মানুষ এতটা বয়সচোরা হয়!

তানিয়া হেসে বলল,
— মা, অমিয় আমার বন্ধু।

তানিয়ার মা বললেন,
— বন্ধুর সঙ্গে বিয়ে হয় না।

অমিয় তখনও বুঝতে পারছে না সে বেঁচে আছে, নাকি লজ্জায় মাটির নিচে ঢুকে গেছে।

তানিয়ার মা আবার বললেন,
—অমিয়, তোমার মা-বাবাকে বাসায় পাঠিয়ো, আমরা কথা সেরে নেব।

অমিয় মাথা নিচু করে তানিয়ার মায়ের দিকে তাকালো। ঠিক তখনই কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে কয়েকটি পাপড়ি ঝরে পড়ল। মনে হলো, গাছটাও যেন অমিয়ের বোকামিতে হেসে উঠল।

গ্রামঃ জগন্নাথদী, পোঃ ব্যাসদী গাজনা
উপজেলাঃ মধুখালী, জেলাঃ ফরিদপুর


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: