মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন
মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম, কুলাউড়া প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের শ্রমিক লাইনের ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে কেটেছে যার শৈশব, সেই শান্তা যাদব আজ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়ে এক নতুন ইতিহাস গড়েছেন। পরিবারের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও কম হওয়া সত্ত্বেও মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি অর্জন করেছেন প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের সম্মানজনক শিক্ষাবৃত্তি।
শান্তার বাবা লক্ষ্মীনারায়ণ যাদব ও মা রীনা যাদব দুজনই লংলা চা-বাগানের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক। সীমিত আয়ে সংসার চালানোই যেখানে ছিল নিত্যদিনের সংগ্রাম, সেখানে সন্তানের উচ্চশিক্ষার চিন্তা করা ছিল একরকম অভাবনীয়। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শহরের বড় কোনো বিদ্যালয়ে নয়, লংলা চা-বাগানের স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলেই তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। তবে প্রবল ইচ্ছা ও মেধার জোরে তিনি সেই প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে এগিয়ে যান। পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি নিজের স্বপ্নের বুনিয়াদ আরও শক্ত করেন।
শ্রীমঙ্গলের পাঠ চুকিয়ে শান্তা ভর্তি হন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (AUW)-এ। সেখান থেকে তিনি জনস্বাস্থ্য (Public Health) বিষয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি ‘চা ছাত্র সংসদ’-এর শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় চা-বাগানের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করা এবং তাঁদের অধিকার নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
স্নাতক শেষ করার পর বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রমাণের লক্ষে আবেদন করেন বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে। ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অফার পেলেও তিনি বেছে নেন বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলকে। হার্ভার্ডের অত্যন্ত সম্মানজনক ‘মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি’ (MMSc-GHD) প্রোগ্রামে স্থান করে নেওয়ার পাশাপাশি তিনি পান প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবৃত্তি।
চা-বাগানের অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসার ভোগান্তি ও সেবা বঞ্চিত হওয়ার চিত্র খুব কাছ থেকেই দেখেছেন শান্তা। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এই প্রোগ্রামটি সীমিত সম্পদের পরিবেশে কার্যকর বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ও সেবা নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে কাজ করে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সম্পন্ন করার পর তিনি নিজ জনপদ কুলাউড়ায় ফিরে আসতে চান। অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চা-বাগানের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে অবদান রাখাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের এই কন্যার হার্ভার্ড জয় কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি পুরো চা-জনগোষ্ঠী এবং দেশের প্রান্তিক জনপদের তরুণদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা ও মনস্তাত্ত্বিক জয়।