শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার- ড. মাহবুব মোমতাজ

আজ ১৬ জুলাই মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদারের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৮ সালের আজকের দিনে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আমাদের ছেড়ে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে চলে গেছেন। জামালপুরের এই কীর্তিমান পুরুষ, ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ প্রদেশের ময়মনসিংহ জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৩৪ সালের ১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। আওনা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী তালুকদার পরিবারের সন্তান মতিয়র রহমান শৈশব থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। যে গ্রামের আলো বাতাসে ছোট্ট মতিয়র রহমান বেড়ে উঠেছিলেন সেই গ্রামেই ঘুমিয়ে আছেন জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান। বর্তমান জামালপুর জেলার দক্ষিণে সরিষাবাড়ী উপজেলার যমুনা নদীর কুল ঘেষে গড়ে উঠা ছায়া ঘেরা দৌলতপুর গ্রাম আজ গর্বিত এই ক্ষণজন্মা মনীষীকে ধারণ করে আছে বলে ।

শিশু মতিয়র রহমান প্রাইমারি স্কুলের বারান্দা থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দেখে দেখে বিপ্লবী সত্তায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের ‘গ্রেট ক্যালক্যাটা কিলিং’-এর অভিঘাত এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ আন্দোলন দ্বারা মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র মতিয়র রহমান প্রভাবিত হয়েছিলেন। বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর উত্তাল রূপ, গ্রামের চিরায়ত সবুজের উদারতা আর প্রকৃতির বৈরী পরিবেশ থেকে সাহস আর শক্তি নিয়ে মতিয়র রহমান কলেজ জীবনে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের নানা বাঁক প্রত্যক্ষ করেছেন। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ‘যুক্তফ্রন্ট’ নির্বাচন এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রতি আইয়ুব খানের অসহযোগিতা মতিয়র রহমানকে আন্দোলিত করেছিল। কলেজ জীবনে মেধাবী ছাত্র মতিয়র রহমান ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভের সৃষ্টি হতে থাকে। সামরিক শাসনের সেই উত্তাল সময়ে মতিয়র রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালেই মতিয়র রহমান বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পড়েন এবং এ বছরই কৃতিত্বের সঙ্গে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন।

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে মতিয়র রহমান তালুকদার সরকারি চাকরিতে নিজেকে জড়াতে চাননি। অর্থ ও বিত্ত বৈভবের মধ্যে বেড়ে ওঠা মতিয়র রহমান তালুকদার জামালপুরের দরিদ্র, অসহায় মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ার ইচ্ছে নিয়ে আইনজীবীকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মেধাবী আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা পেশ করার পর বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক সরকার আইয়ুব খানের নানা ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রহসনের বিচার শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ফুঁসে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালে দেশব্যাপি গণ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে জামালপুরের সাধারণ মানুষও সে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার আইন পেশাকে স্থগিত রেখে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের’ আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ার পরেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানান। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষনের মধ্যদিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার জামালপুরে সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে উজ্জীবিত হয়ে আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার জামালপুরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। জীবনের মায়া আর পরিবারে স্ত্রী সন্তানের কথা না ভেবে দেশ মাতৃকার মুক্তি ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। পেশা, পরিবার, অর্থবিত্ত সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসীম সাহস আর নির্ভীক ভূমিকায় সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর (কামালপুর) মহেন্দ্রগঞ্জে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বিচারকের (ম্যাজিসষ্ট্রেসি) দায়িত্ব পালন করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ পুর্নগঠনে তিনি জামালপুরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলে এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। দেশব্যাপী রাজনৈতিক দমন পীড়ন শুরু হলে এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদারকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তাঁর ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সরে যেতে নানাভাবে চাপ দেয়া হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অজেয় শক্তি ধারণ করেছিলেন বলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। দুর্বার সাহস আর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীক্ষা নিয়ে এগিয়ে গেছেন অবিচল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপর নেমে আসে রাজনৈতিক খড়গ। এরকম এক দুঃসময়ে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের একাদশ সম্মেলনে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন দলের আহ্বায়ক হয়ে দলকে গোছানোর দায়িত্ব নিলে জামালপুর জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবীদ জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন পর পর তিনবার।

এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দুরদর্শিতা, সততা আর অটল নীতির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আদর্শ বহন করে গেছেন আজীবন। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বর্ণাঢ্য জীবনে জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন ৬ বার এবং জাতীয় আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জামালপুর ল’ কলেজ প্রতিষ্ঠা করে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। দুঃস্থ অসহায় মানুষের সেবা দিতে জামালপুর অন্ধ কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জামালপুর জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন। জনবান্ধব মানবতাবাদী এই মানুষটি সারাজীবন জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর স্বপ্ন সফল হয়েছে। ২০১২ সালে ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা রেল সংযোগ (তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু) এবং এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার রেলস্টেশন উদ্বোধন করে এলাকার মানুষের আশা পূরণ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০২০ সালের জানুয়ারির ২৬ তারিখে জামালপুরের জনগণের জন্য ‘জামালপুর এক্সপ্রেস’ নামে একটি অত্যাধুনিক আন্তঃনগর ট্রেন চালু করেছেন। যা এই সংযোগ লাইনে ঢাকা থেকে জামালপুর চলাচল করছে। সমাজসেবক, কর্মবীর ও রাজনীতিবীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদারের আজ প্রয়াণ দিবসে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : চেয়ারম্যান, সমাজকর্ম বিভাগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদালয়, জামালপুর এবং আহ্বায়ক এডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার স্মৃতি পরিষদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি