সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪২ পূর্বাহ্ন

আমি বাউল, ইসলামপন্থি, আস্তিক, নাস্তিক সবার মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াব – ফরহাদ মজহার

কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক এবং দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা’ (উবিনীগ) এবং নয়াকৃষি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সম্পাদনা করছেন সাপ্তাহিক ‘চিন্তা’। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঔষধশাস্ত্রে স্নাতক এবং পরে অর্থশাস্ত্র পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চ’-এ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’, ‘মোকাবিলা’, ‘এবাদতনামা’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘মার্ক্স, ফুকো ও রুহানিয়াত’, ‘ক্ষমতার বিকার’ ইত্যাদি। ফরহাদ মজহারের জন্ম ১৯৪৭ সালে নোয়াখালীতে।

বাউলদের ওপর হামলার ঘটনা মানবাধিকারেরও স্পষ্ট লঙ্ঘন। সে ব্যাপারে কী বলবেন?

আমি তো সেই মানুষ, যখন শেখ হাসিনা সরকার ৫ মে হেফাজতের ওপর গুলি চালিয়ে মারছিল তখন আমি তাদের পক্ষে মাঠে নেমেছিলাম। আমি তো সেই একই মানুষ। তার মানে কি আমি বাউল কিংবা ইসলামপন্থিদের পক্ষে দাঁড়াব না, তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলব না? আমি তো নাস্তিক বা আস্তিক ওই ভাগ করব না, আমি মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াব। তার মানে, আমাকে তাদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

বাউলের ওপর আক্রমণের ঘটনার সঙ্গে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী চিন্তা কাঠামোর কোনো সম্পর্ক আছে কিনা? এই দ্বিধাবিভক্তির কারণ কী?

আমাদের চিন্তা কাঠামোতে পরিবর্তনটা বেশ ভালোভাবে ঘটেছে। আপনি সাপ্তাহিক চিন্তা দেখলে বুঝবেন। তরুণদের অনেকে মনে করেছেন, ফরহাদ ভাই হয়তো মৌলবাদী বা জামায়াতি হয়ে গেছেন। তরুণদের বড় একটা অংশ এটাই মনে করেন। ফলে তারা তো আমার কাছে আসেন না, জানতে চান না যে আমি কী বলতে চাচ্ছি। আমার একটা ভাষা, বক্তব্য সমাজে যাচ্ছে। আমি একটা লড়াই সমাজে করছি। ফলে এই পোলারাইজেশনের কেন্দ্রে আমার অবস্থান। এটি খুব পরিষ্কার। আমি যখন ফকির লালন শাহের পেছনে বিগত ৩০-৪০ বছর কাটিয়েছি। কেন কাটিয়েছি? একটি দার্শনিক অনুসন্ধানের জন্য। সেই অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি আমার আছে।

তাহলে গণঅভ্যুত্থানের পর ভাষা ও চিন্তায় আদৌ কি কোনো পরিবর্তন ঘটেছে?

বাংলা ভাবজগতের মধ্যে একটা বিপ্লব ঘটেছে। আমি যে ভাষায় কথা বলি, তথাকথিত ত্রিশের দশকে সাহিত্যের ভাষা কিংবা কলকাতার ভাষা। এ ভাষায় তো ফকির লালনকে বুঝব না। এটা অসম্ভব। তাহলে আপনি আমাকে বলুন, বাংলাদেশের কোন বুদ্ধিজীবী তাঁর জীবনে বিরাট এতটা অংশ কাটিয়েছেন তাঁর ভাষাকে বদলানোর জন্য, ভাষার অর্থ বোঝার জন্য। আমি তো তা করেছি। এটা তো পরিশ্রমের কাজ। যে কোনো জনগোষ্ঠীকে গড়ে তোলার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হবে এবং ভাষার বদলটা যেহেতু চিন্তার বদল, চিন্তার বদল করার ভাষাটাকে অর্জন করাটা একটা বিশাল রাজনৈতিক লড়াই। এটা সিম্পলি সাহিত্যের ব্যাপার নয়।
যেমন?

যেমন–আমরা আজ সেক্যুলারিজম বনাম ইসলাম এই বিরোধটা করতে চাই না। তাহলে গণঅভ্যুত্থানের পরে কোন ভাষায় কথা বলব–বলুন তো? আমরা রাষ্ট্রে ফোকাস করেছি। গণসার্বভৌমত্বে, জনগণের কাছে ক্ষমতা দাও, দাবি করছি। আমরা বলেছি, ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট, আর তথাকথিত সেক্যুলার ফ্যাসিস্ট–এই দুমুখো সাপের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এদের কোনো পক্ষের ভাষা বা বয়ান কি আমরা গ্রহণ করি? না।

আপনি কি মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর জাতিবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটেছে?

যাদের আপনি ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট দেখছেন, এদের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নাই। এরা হলো জাতিবাদী, ধর্মকে তারা জাতিবাদী আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। আমি মুসলমান, আমরা একটা ‘জাতি’, আমাদের কথা ও ব্যাখ্যাই একমাত্র সহিহ। এটাকে বলে জাতিবাদ। এটা একদমই হিটলারের জাতিবাদী ফ্যাসিবাদেরই একটা ধর্মীয় রূপ, ধর্মীয় উস্কানি। এটাই তো সংকটের জায়গা। আমাদের তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এখনও ফ্যাসিবাদ কী–সেই ধারণা পরিষ্কার নয়।

তাহলে এখানে ‘সত্য’ অন্বেষণের একটা বিতর্ক হাজির হয়। এ ব্যাপারে আপনার কী মত?

ইসলামের জায়গা থেকে একটা বিতর্ক করি। ইসলাম বলে, প্রথমত মানুষের পক্ষে সত্য নির্ণয় করা সম্ভব না। মানুষ দাবি করতে পারে না, আমি সব কিছু জানি। কেন মানুষ দাবি করতে পারে না? কারণ, মানুষ মরণশীল। মৃত্যু মানুষের সীমা সীমিত করে দিয়েছে। ফলে আপনি যদি সত্যের কথা বলতে চান, একমাত্র সত্য হলেন আল্লাহ। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারছেন, আপনি হলেন সময় ও কালের মধ্যে আবদ্ধ; অন্যদিকে আল্লাহ সময় ও কালের মধ্যে আবদ্ধ নন। সময় ও কালের মধ্যে যিনি আবদ্ধ নন, সেই গায়েবের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ধরন কী হবে? এটা ইসলাম খুব সুন্দর করে তুলে ধরে। দার্শনিকভাবে যাকে বলা হয়– গায়েবে ইমান আনতে হবে। গায়েব, মানে অদৃশ্য নয়। যা দৃশ্যমান নয়, তা ভিন্ন কালে বা ভিন্ন জায়গায় দৃশ্যমান হতে পারে। ‘গায়েব’ মানে যিনি নিত্য অনুপস্থিত। তিনি কখনোই কোনো দেশকালে দৃশ্যমান নন। তাই গায়েব মানে অদৃশ্য ভাবা ভুল হবে। যেমন–আমি একটু আগে ওই রুমে গায়েব ছিলাম, আবার দৃশ্যমান হয়েছি–এ রকম না। আল্লাহ কখনও দৃশ্যমান নন। তাই পুরো বিশ্বজগৎ তাঁর কিতাব বা বই। অর্থাৎ তিনি গায়েব কিন্তু তিনি কেতাব বা চিহ্নব্যবস্থা হিসেবে বর্তমান আছেন। আল্লাহর এই কেতাব আপনাকে পড়তে জানতে হবে। তাহলে এই বিশ্বজগৎ যে একটা বই বা গ্রন্থের মতো, তা পাঠ করার এক ধরনের রীতি ইসলামে আছে, আমরা ওই ইসলামে তো কখনও প্রবেশ করিনি। প্রবেশ না করার কারণে কখনও ডলারের দ্বারা, কখনও ইসরায়েলি মোসাদের টাকায়, কখনও ‘র’-এর টাকায় ইসলাম সম্পর্কে একটা ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছি; যাকে আপনি বঙ্গীয় আব্বাসী ইসলাম বলতে পারেন। যে দার্শনিক প্রজ্ঞামণ্ডিত ইসলামের কথা বলছি, তার সঙ্গে হিংস্র ও জাহেলিয়াত-দুষ্ট ইসলামের কোনো সম্পর্ক নাই। আর হিংস্র ও জাহেলিয়াত-দুষ্ট ইসলাম ব্যবহার করা হয়েছে কীভাবে? একটা জাতিবাদী সেন্টিমেন্ট দ্বারা।

সমাজে তো নানা ব্যাখ্যা থাকে।

আপনার তর্ক ইসলামেরই একটি পদ্ধতিও বটে। আপনি বলতে পারেন, আপনার একটা ব্যাখ্যা থাকবে, ওর একটা ব্যাখ্যা থাকবে, ফরহাদ ভাইয়ের একটা ব্যাখ্যা থাকবে। এ রকম কী? ইসলাম বলবে, না। এ রকম হতে পারে না। আপনাকে যে বুদ্ধি দিয়েছে, আমাকেও একই বুদ্ধি দিয়েছে। আমি তো মায়ের পেট থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে বের হয়নি। আমাকে বুদ্ধি, বিবেক দিয়েছে। কেন? যাতে আমি কোরআনটা পড়তে পারি। কীভাবে পড়তে পারি? মুত্তাকিন হয়ে পড়তে পারি। আমি যদি মুত্তাকিন হই, আমি যদি আত্মসমর্পণকারী হই, তাহলে আমি কীভাবে পড়ব? এমনভাবে পড়ব, যাতে হেদায়েতপ্রাপ্ত হই। কোরআন কোনো বিধান বা আইনের বই নয়, সেটা কোরআন নিজেই বলেছে। আক্ষরিকভাবে আমরা কোরআন পড়ব না। হেদায়েতের জন্য পড়ব। কার হেদায়েতের জন্য? আমি যে দেশ, কাল, পাত্রে আছি–ধরেন ২০২৫ সালে আমার অবস্থান–২০২৫ সালে ফরহাদ মজহার যেভাবে পড়বে, আর আজ থেকে এক হাজার বছর আগে আরেকটা মানুষ একইভাবে পড়বে না। ফলে কোরআন আছে হেদায়েতের জন্য। ‘হুদাল্লিল মুত্তাকিন’। এটা কোরআন শরিফে লেখা আছে। তাহলে যাদের কথা আপনি বলছেন, যারা ইসলামের দাবি নিয়ে ঝান্ডা তুলে আছে, ধর্মবাদী–এরা তো ইসলামের লোকই নয়।

তাহলে সমস্যার সমাধান কী?

তাদের বোঝাতে হবে। আমাদের মতো যারা আছি, তাদের হজরত ঈসা নবীর মতো দরকার হলে ক্রুশকাষ্ঠে ঝুলতে হবে। একটা জনগোষ্ঠীর পথ তৈরি করার জন্য, রক্ত দেবার জন্য আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। আপনি দাঁড়িয়ে ক্রুশকাষ্ঠে ঝুলেও আপনাকে বলতে হবে যে, আল্লাহ এদের মাফ করে দাও। কারণ, এরা কী করছে এরা তা জানে না। ফলে আজকে যেসব বোকা, আহম্মক আমাকে বুঝতে পারছে না, ওদের বিরুদ্ধে আমি কী করব? আমি বলব, আল্লাহ ওদের মাফ করে দাও। ওরা বুঝতে পারছে না, আমি এখন কী করব? আমি কি এখান থেকে সরে যাব নাকি? আমি তো সরে যাব না। আমাকে তো শতকোটি লোকের কথা ভাবতে হবে। এই শতকোটি লোকের কথা ভেবে আমাদের মতো দু-একজনকে এভাবে সামনে থাকতেই হবে। এর কোনো বিকল্প পথ নাই। আমি বলব, তরুণদের উচিত হবে এটা বিচক্ষণতার সঙ্গে, কৌশলের সঙ্গে মোকাবিলা করা।

গণঅভ্যুত্থানের পর সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে একটা পিচ্ছিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা চিহ্নিত করা কঠিন?

নাহ, আমি তা মনে করি না। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেক্যুলার জাতিবাদী ফ্যাসিজমের পরাজয় ঘটেছে, তথাকথিত বাঙালিপনা। এটা তো এক ধরনের ধর্মীয় উন্মাদনাই ছিল। তাদের চিন্তাচেতনার যে জগৎ, সেটা কি ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে আলাদা কিছু? বাংলা ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে ক্রিটিক্যালি চিন্তা করতে পারেনি, যাতে বিপরীতে ধর্মীয় জাতিবাদী সেন্টিমেন্ট ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা করা যায়। যদি তারা ক্রিটিক্যালি চিন্তা করতে পারত, তাহলে তো ইসলাম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বাইরে থাকত না। আমাদের চিন্তাচেতনার অন্তর্গত হয়ে যেত, আলাদাভাবে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কোনো ভিত্তি থাকত না। দেশে জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী রাজনৈতিক দল বলে কোনো দলই থাকত না; থাকলেও ছোটোখাটো দু-একটি থাকত, যেগুলো সব সমাজে থাকে। তাহলে আমরা আমাদের যে ইডিওলজিক্যাল সমস্যার সমাধান করতে পারিনি, আর তার কোনো রাজনৈতিক মীমাংসা দিই না– এটাই তো সেই অমীমাংসার ফর্মে হাজির হয়েছে। তাহলে এটা তো খুব ভালো।

এটা তো মীমাংসা হচ্ছে না। তাহলে ভালো কীভাবে হলো?

আপনি যখন চিনতে পারছেন এবং আমার সঙ্গে একমত হচ্ছেন যে ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই, যখন বুঝতে পারছেন এটা একান্তই ধর্মবাদী ফ্যাসিজম; যে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি বাঙালি জাতিবাদ করেছে, সেই একই পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট রাজনীতি করছে। শ্রেণিগত দিকে তাকান। যে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি সেক্যুলারের নামে প্রান্তিক মানুষের ওপর দিনের পর দিন অত্যাচার করেছে, সেই একই পেটি বুর্জোয়া ধর্মীয় ফ্যাসিস্টরা প্রান্তিক গরিব ও সর্বহারা মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে। তাহলে বিষয়টা শ্রেণি-সংক্রান্ত প্রশ্ন। শ্রেণি প্রশ্ন যদি হয়ে থাকে, তাহলে ফরহাদ মজহার তো কার্ল মার্ক্সের ছাত্র। আমরা এগুলো বুঝি, তাহলে ওরা তথাকথিত মার্ক্সিস্ট ও কমিউনিস্ট দাবি করা লোকজন কেন ক্লাস-কোয়েশ্চেন বোঝেন না?

এই দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে বাউল প্রশ্নটি আমরা কীভাবে দেখব?

বাউলদের গ্লোরিফাই করার কিছু নেই। ৩০ বছর ধরে বলছি, ‘বাউল’ শব্দটাই প্রবলেমেটিক। কই তারা তো তখন কোনো সাড়া দেননি? কোনো সেক্যুলার তো এখনও পর্যন্ত বলেনি, বাউল শব্দটা সমস্যাজনক। এ ব্যাপারে আমার প্রচুর লেখা আছে। লালনকে ‘বাউলসম্রাট’ বলা হয়েছে, অথচ তিনি বাউলসম্রাট ছিলেন না। তিনি ছিলেন ফকির, তিন তাঁর গানে কোথাও নিজেকে ‘বাউল’ বলেননি, তিনি নিজেকে বলেছেন, ফকির। বাউল বলার মধ্য দিয়ে আপনি দুনিয়ার যত ব্যভিচার, অদ্ভুত অদ্ভুত চিন্তা–যা লালনের মধ্যে নাই, যা কোনো সত্যিকার সাধকের চর্চার মধ্যে নাই–সেইসব তাদের বইয়ে ঢোকাইছে। লালন নিয়ে উপন্যাস লিখেছে, ‘মনের মানুষ’ সিনেমা বানাইছে। আপনার মনের মতো করে ‘কসমিক সেক্স’ সিনেমাও বানাইছেন। হুজুররা ওখান থেকে সবকিছু শিখছে। এখন আপনার মনে যখন আঘাত লাগছে, আপনি তাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন।

আপনি নিজেই দাবি করছেন, আপনি এককভাবে সমস্যাটি চিহ্নিত করেছেন। যে সেক্যুলার ও তরুণ বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে বিভ্রান্ত বা অজ্ঞ, তাহলে অচিরেই এই সমস্যার সমাধান কি সম্ভব?

এককভাবে করেছি, দাবি করিনি। আর কেউ করে থাকলে নাম বলুন। আমার মনে হয়, এটা অত্যন্ত ভালো দিকে যাচ্ছে। এই পোলারাইজেশন বা বিভক্তি নিয়ে লোকজন চিন্তা করতে বাধ্য হবে। ১৯৪৭ সালের পর যখন মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগের উত্থান হলো, এরপর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান হলো–তখনও ধর্মীয় জাতিবাদের ভিত্তিতেই সেটা ঘটেছে। ইতিহাস সদাসর্বদা এ রকম মেরূকরণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। এই দ্বন্দ্বে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। এটা রিজলভ করাটাই প্রশ্ন। নিশ্চয় আমরা এর সমাধান করতে পারব বলে মনে করি। কোনো সন্দেহ নেই। আপনি দেখবেন, কয়দিন পরে পরিস্থিতি বদলে যাবে।

আপনি কেন ভুলে যাচ্ছেন, এই কয়দিন আগে– ২০১৩ সালে হেফাজত নিয়ে আমার বিরুদ্ধে শাহবাগ কী পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল? ইসলামী জাতিবাদের বাইরে বা ইসলাম ও সেক্যুলারিজম দ্বন্দ্ব পরিহার করে আক্ষরিক অর্থে আমি একাই শাহবাগকে কি মোকাবিলা করিনি? লাখ লাখ লোককে ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার বাইনারির বাইরে আমি কি মোকাবিলা করিনি? করেছি তো। তাহলে এটাকে কেন মোকাবিলা করতে পারব না? আপনি এটা কী বলেন? অবশ্যই পারব। ফলে এটা কোনো সমস্যাই নয়।

সেটা কীভাবে সম্ভব?

কথা হচ্ছে, আপনি সত্যিকারভাবে মনে করেন কিনা যে আপনি জনগণের পক্ষের লোক? ফলে একটা লোক যদি আমাকে আজ ভুল বোঝে, তখনও কি আমাকে ভুল বোঝেনি? আমারই বন্ধুবান্ধব আমাকে ভুল বুঝে চলে গেছে। জামায়াতি হয়ে গেছে, বামাতি হয়ে গেছে–বলেছে তো। আমারই বন্ধুবান্ধব বলেছে, জামায়াতিরা নাকি আমাকে কোটি কোটি টাকা দিয়েছে। এরা তো বলেছে, তারা এখন কোথায়? আর আমি কোথায়? তাহলে আজকেও যদি এ বিষয়গুলো আসে, আমি কখনও কোনো পক্ষকে এখানে কোনো দোষারোপ করতে আসিনি। আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, এটা সমাজের একটা দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বটা হাজির হয়েছে প্রকটভাবে। এই প্রকটতা হতো না, যদি রাষ্ট্র এটাকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করত। করেনি, বেশ। কিন্তু আমরা রাষ্ট্রকে আরও জটিল জায়গায় ঠেলে দেব, এটা আমাদের কর্তব্য নয়।

তাহলে আমাদের কর্তব্যটা কী?

আমাদের এ ক্ষেত্রে কর্তব্য হলো– সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় হোক বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হোক– তাদের সহযোগিতা করা। কারণ এই বিশৃঙ্খলা বিদেশি শক্তিকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করতে সুযোগ করে দেয়। ফলে আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, জনগণের উষ্মা–বিশেষত ইসলাম সম্পর্কে দীর্ঘকালের অজ্ঞতার কারণে তাদের যেসব ক্ষোভ-বিক্ষোভ তারা প্রকাশ করছে, সেটা মহাদেবের বিষ খাওয়ার মতো করে সহ্য করতে হবে। এটাই আমাদের এখনকার কর্তব্য। আর সেটা আপনি সবসময় জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে করতে হবে। মহত্তম কাজটা এভাবেই জনগণকে সঙ্গে নিয়েই করতে পারবেন। বাউলদের পক্ষে ও বিপক্ষে উভয়ের কথা আমাদের শুনতে হবে। শুনে তার সমাধান করতে হবে।

দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের জন্য সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

আপনাকে ও সমকালকে ধন্যবাদ।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: