মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৫:৪২ অপরাহ্ন

স্থবিরতা ছাত্রলীগে: হতাশ কেউ বিয়ে করেছেন, কেউ চাকরিতে

নিউজ ডেস্ক :: বিশ্ববিদ্যালয়, জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি না হওয়া, গঠনতন্ত্র না মানা, প্রেস বিজ্ঞপ্তি নির্ভর কমিটি দেওয়া, কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক দায়িত্ব না দেওয়া, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের একক স্বেচ্ছাচারিতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠাসহ নানা কারণে সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর, জেলা, উপজেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটের সাংগঠনিক কাজও।

ছাত্রলীগের ১ নম্বর ইউনিট হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককেন্দ্রিক হাতেগোনা কিছু নেতা নিয়ে চলছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এক বছরমেয়াদি হল কমিটি হলেও সেখানে নতুন কমিটি হয়নি পাঁচ বছরেও। এই চিত্র বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর, জেলা, উপজেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটেও।

২০১৮ সালের ১১-১২ মে ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনটিকে সিন্ডিকেটমুক্ত ও সক্রিয় করতে নিজেই উদ্যোগ নেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অভিভাবক ও আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ কারণে গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে সম্মেলনের আড়াই মাস পর ঘোষণা দেওয়া হয় কমিটি।

কিন্তু বছর যেতেই দুর্নীতির অভিযোগে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সেই কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে। পরে ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০১৮ সালের ৩১ জুলাই কমিটি ঘোষণার পর থেকে সাংগঠনিক নানা ব্যর্থতা দেখা যায় ছাত্রলীগে। ২০১৯ সালের ১৩ মে ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে শোভন-রাব্বানীর নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগ। এই কমিটি গঠন থেকেই শুরু হয় নানা জটিলতা ও অভিযোগ। সাংগঠনিকভাবে সমস্যা সমাধান করতে না পারায় আন্দোলন ও অনশন কর্মসূচিও পালন করে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের একাংশ। এমনকি তারা ঈদও পালন করেন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশেই।

সে সময় আন্দোলনের মুখে কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ে ছাত্রলীগ। এতে গণমাধ্যমে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়গুলো বেশ আলোচিত হয়। সমস্যা সমাধানে হস্তক্ষেপ করতে হয় ছাত্রলীগকে দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হককে।

ছাত্রলীগের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমান কমিটির তিন বছরের দায়িত্ব পালনকালে ১১১টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে এখনও কমিটি হয়নি ৮০টিরও বেশি ইউনিটের। ৬৪টি জেলাসহ সমপর্যায়ের ইউনিটের মধ্যে কমিটি হয়েছে মাত্র ১৮টির। এর মধ্যে শোভন-রাব্বানী করেছেন দুটি কমিটির। আর গত দুই বছরে ১৬টি কমিটির মধ্যে জয়-লেখক দুটি সম্মেলন ছাড়া ১৪টি কমিটিই করেছেন প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে।

৩৭টি মেডিকেল কলেজের মধ্যে কমিটি হয়েছে ১২টির, যার সবগুলোই প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হয়েছে। ফলে বর্তমান ছাত্রলীগকে ‘প্রেস বিজ্ঞপ্তি নির্ভর’ ছাত্রলীগ করে ফেলার অভিযোগও উঠেছে।

এছাড়া ১২টি মহানগরের মধ্যে কমিটি হয়েছে মাত্র দুটির। যেসব জেলার কমিটি দেওয়া হয়নি, তার মধ্যে এমনও ইউনিট আছে, যেখানে চার বছর, এমনকি আট বছরেও কমিটি হয়নি। অথচ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ১১ ধারার (খ) ও (গ)-তে বলা আছে, ‘কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কার্যকাল দুই বছর। উপরিউক্ত সময়ের মধ্যে সম্মেলন আয়োজন করতে হবে। অন্যথায় নির্বাহী সংসদের কার্যকারিতা লোপ পাবে। বিশেষ বা জরুরি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভার অনুমোদন সাপেক্ষে কমিটির কার্যকাল তিন মাস বাড়ানো যাবে। উক্ত সভায় প্রতিটি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সদস্যরা যোগ দেবেন।’

এছাড়া ২১ ধারায় জেলা ও অন্যান্য শাখার সম্মেলন প্রতি বছর হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্র থেকে ইউনিট বা শাখা কমিটি, কোথাও সাংগঠনিক কোনো নিয়ম মানার বালাই নেই বর্তমান ছাত্রলীগে। এতে সাংগঠনিক সক্রিয়তা তো নেই-ই, বরং যেন স্থবির হয়ে আছে কেন্দ্র থেকে ইউনিটসমূহের সব সাংগঠনিক কাজ। ফলে হতাশ হয়ে পড়েছেন কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের হাজারো নেতাকর্মী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্রলীগের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল ২০১১ সালে। বরিশাল জেলা ও মহানগর শাখার কমিটিও ২০১১ সালে হয়। তবে এখানকার কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে বর্তমান কমিটি।

মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট জেলা শাখার সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল ২০১৫ সালে। এছাড়া গাজীপুর জেলা ও মহানগর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, সিলেট জেলা ও মহানগর, বগুড়া, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা জেলা উত্তর, দক্ষিণ, নরসিংদী, দিনাজপুর, চট্টগ্রামসহ বেশ কিছু জেলার কমিটি হয়েছিল চার থেকে আট বছর আগে।

আবার যেসব জেলা, মেডিকেল কলেজসহ ইউনিটগুলোর কমিটি দেওয়া হয়েছে, তা সাংগঠনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা বিচার না করে অধিকাংশই সম্মেলন ছাড়া শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েই হয়েছে। এতে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা যেমন নেতৃত্বে আসছে, আবার অভিযোগ উঠছে অর্থ লেনদেনেরও।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ধারা ১৫ এর (ঙ)-তে বলা আছে, ‘প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভা হবে। অন্যান্য সমস্ত নিম্নতম শাখায় প্রতিমাসে অন্তত একবার নির্বাহী সংসদের সভা হবে।’

অথচ গত আড়াই বছরে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভা হয়েছে মাত্র একটি। ছাত্রলীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে গঠনতন্ত্রে না থাকলেও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের বিভাগীয় বা জেলার দায়িত্ব দেওয়ার প্রচলন ছিল। বর্তমান কমিটি সেই দায়িত্বও বণ্টন করেনি। ফলে সাংগঠনিক কোনো দায়িত্ব না থাকা ও নিয়মিত সভা না হওয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রথমবারের মতো পদ পাওয়া নেতারা জানেনই না তাদের কাজ কী।

এজন্য নতুন-পুরোনো মিলিয়ে বর্তমান কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। এমনকি নিষ্ক্রিয়তার ফলে অনেকে অন্য সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকে চাকরি নিয়েছেন।

যেমন ছাত্রলীগের কমিটিতে তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্বে থাকাবস্থায়ই শাকিল আহম্মেদ জুয়েল বাবু স্বেচ্ছাসেবক লীগে পদ পেয়েছেন, উপ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মনিরুজ্জামান তরুণ হয়েছেন যুবলীগের সদস্য, সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান হাফিজ ঢুকে গেছেন চাকরিতে। সংগঠনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে অনেকে আবার বিয়ে করে ব্যবসা-বাণিজ্যেও সম্পৃক্ত হয়ে গেছেন।

কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকের অভিযোগ, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সংগঠনে একক আধিপত্য ও স্বেচ্ছাচারিতা ধরে রাখতে বাকি নেতাদের সাংগঠনিক কোনো দায়িত্ব দিচ্ছেন না।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ইয়াজ আল রিয়াদ বলেন, ‘কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অথচ অনেকে জানেই না তার কাজটা কী! কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো দায়িত্ব বণ্টন হয়নি। কেন্দ্রীয় কমিটির সবার দায়িত্ব, কাকে নেতা বানাচ্ছি তা নিয়ে সভায় আলোচনা করা। সেই আলোচনা হয় না। অনেকে জানেই না প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কমিটি করা হচ্ছে, যা করার নিয়ম নেই। এভাবে কমিটি হলে অনৈতিক কাজ হয়, ঝামেলা বাড়ে। অযোগ্যরা নেতা হয়। কেন্দ্রীয় পরিষদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা দরকার। কমিটি করতে হলে কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকেরই নয়, সেন্ট্রাল বডির অনুমোদন দরকার।’

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেরই অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এই সমন্বয়হীনতার দায় বর্তমান সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের। সাংগঠনিক সফরে কোনো টিমও পাঠান না তারা, নিজেরাই করেন সবকিছু।

জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো সমন্বয় নেই। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তি নির্ভর ছাত্রলীগ হয়ে যাওয়ার দায় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে নিতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দায়ী নয়। এই দায় ব্যক্তির, ছাত্রলীগের নয়।’

সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের নজিরও ঘটেছে বর্তমান কমিটিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংসদের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ও হল ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী দাস তন্বী নিজ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জিয়াসমিন শান্তা ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বেনজির হোসেন নিশিসহ পাঁচ নেতাকর্মীর হাতে মারধরের শিকার হন। এতে সাংগঠনিক কোনো সমাধান না পেয়ে আদালতের দারস্থ হন তন্বী।

বিষয়টি মীমাংসা করতে না পারায় সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষায়ও জয়-লেখকের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে বলে দাবি খোদ ছাত্রলীগেরই একাধিক নেতার।

সার্বিক বিষয়ে ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন করোনার কারণে সেভাবে সাংগঠনিক কাজ করা যায়নি। প্রেস রিলিজে কমিটি দেওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না। ওদের (ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির) মেয়াদও শেষ পর্যায়ে। ভারমুক্ত করে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে দুই বছর শেষ হলে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সময় মতো সম্মেলন হবে, আমরা আশা করছি।’

সংগঠনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা বারবার বলেছি, ঘরে বসে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের কমিটি হয় না। কমিটি করতে হলে ইউনিটে যেতে হবে, সম্মেলন করতে হবে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কমিটি দিতে হবে। এরা (ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) ঢাকায় বসে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এটা তো অনৈতিক। এই অনৈতিক কাজের সঙ্গে একমত নই। তাদের এসব বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে এবং বিভিন্ন প্রোগ্রামে বক্তব্যে বারবার বলা হয়েছে। তারা এই অনৈতিক কাজটি করেই যাচ্ছে। আমরা এসব কর্মকাণ্ডে তাদের প্রতি অখুশি।’

সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা ও স্থবিরতার বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল এবং ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি