শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১১:৫৮ অপরাহ্ন
আগামীকাল মহান ১লা মে—মে দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা বা সাধারণ ছুটির দিন নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার,মর্যাদা এবং ন্যায়ের জন্য দীর্ঘ লড়াইয়ের এক জীবন্ত প্রতীক।
১৮৮৬ সালের শিকাগোর সেই উত্তাল রাজপথ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকদের সেই অবিস্মরণীয় ত্যাগের কথা। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো সেই শ্রমিকরা বিশ্বজুড়ে শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তাদের রক্তরাঙা সেই ইতিহাস আজও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আমাদের সাহস জোগায়।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির জোয়ার আর সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও, শ্রমিকদের মৌলিক বাস্তবতার চিত্রটি খুব একটা বদলায়নি। আজও Fair Wage (ন্যায্য মজুরি), Job Security (চাকরির নিরাপত্তা) এবং Workplace Safety (কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা) অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির বিশাল বিশাল পরিসংখ্যানে শ্রমিকের অবদান স্বীকৃত হলেও, বাস্তব জীবনে তারা প্রায়শই বঞ্চনার শিকার।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির Backbone (মূল চালিকাশক্তি) হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, Policy (নীতিমালা) এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি বিস্তর ব্যবধান রয়ে গেছে। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় শ্রমিকদের জীবনে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ঝুলে থাকে।
তবে আশার কথা এই যে, বর্তমান বি এন পি সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচি ও নির্বাচনী অঙ্গীকারে শ্রমিকদের মর্যাদা, অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
মজুরি কমিশন: মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। সামাজিক সুরক্ষা: বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য টেকসই পেনশন ব্যবস্থা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবার কার্ড। কর্মপরিবেশ: নিরাপদ আবাসন ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ। অধিকার ও সমতা: গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সংরক্ষণ, শিশুশ্রম নির্মূল, নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা ও সমান সুযোগ প্রদান।
বৈষম্য দূরীকরণ: আউটসোর্সিং প্রথার মতো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বিলোপ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। আমরা বিশ্বাস করি, ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখেই শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব। শ্রমিকের পরিবারের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তবেই একটি উন্নত জাতি গঠন সম্ভব হবে। মে দিবসের মূল বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট: শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি তার Fundamental Right (মৌলিক অধিকার)। শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক তখনই অর্থবহ হবে,যখন তা দয়া নয়, বরং ন্যায্যতা, সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে। শ্রমিকের অধিকার যেন কেবল স্লোগানে বা পোস্টারে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা যেন বাস্তবায়নের আলো দেখে। এটি রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং সমাজের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এই মে দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—অধিকারের বাস্তব প্রতিফলন। এটিই হোক আমাদের Shared Responsibility (অভিন্ন দায়বদ্ধতা)।