শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১১ অপরাহ্ন
বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। জনগণের ভোটে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, নির্বাচনের পরবর্তী বাস্তবতায় কিছু বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির আচরণ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এনসিপি (NCP)-এর ভূমিকা এখন স্পষ্টতই দ্বিমুখী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে এই গোষ্ঠীগুলো একের পর এক শর্ত জুড়ে দিয়ে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা করেছে—কখনও “জুলাই সনদ”, কখনও প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) পদ্ধতি, কখনও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে আয়োজনের দাবি, আবার কখনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার বিচারকে সামনে এনে নির্বাচন আটকে দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের চাপ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো- যখন নির্বাচন ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, জনগণ তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে, তখন আবার কেন অস্থিতিশীলতার হুমকি?
বাস্তবতা হচ্ছে, সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার পরিবর্তে একই পুরোনো কৌশল- রাজপথে আন্দোলনের হুমকি, উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা- আবারও দৃশ্যমান। এটি কি গণতন্ত্রের চর্চা, নাকি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা?
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে যে মব-সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতার নানা ঘটনা ঘটেছে, সে প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মহলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি-সমর্থিত গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল- যা রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও জটিল করে তোলে।
এরই মধ্যে বর্তমান সরকার রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে- যা দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফুটপাত দখলমুক্ত হলে একদিকে যেমন চলাচল সহজ হয়, অন্যদিকে চাঁদাবাজি ও অবৈধ নিয়ন্ত্রণের একটি বড় চক্র ভেঙে যায়। অথচ এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করেই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে, এমনকি রাজপথে মিছিলও করেছে। প্রশ্ন হলো- এখানে জনস্বার্থ বড়, নাকি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চাপ?
একটি নির্বাচিত সরকার মাত্র দুই মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যখন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজমান, তখন দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ঠিক এই সময়েই অযৌক্তিক দাবি ও আন্দোলনের হুমকি দেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো- কিছু অখ্যাত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী, যারা কার্যত বিরোধী রাজনীতির “বি-টিম” হিসেবে কাজ করছে, তারা প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও চরিত্রহননে লিপ্ত। এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক শালীনতাকেই ধ্বংস করছে না, বরং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেও বিপন্ন করছে।
সংসদই যেখানে হওয়া উচিত মতবিনিময় ও বিরোধিতার প্রধান ক্ষেত্র, সেখানে সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেয়- তারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়, বরং চাপের রাজনীতির মাধ্যমে ফায়দা নিতে চায়।
বাংলাদেশের জনগণ ইতোমধ্যে তাদের রায় দিয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিপক্বতা, দায়িত্বশীলতা এবং গণতান্ত্রিক আচরণ। বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের ভুলগুলো তুলে ধরা, বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া এবং সংসদে শক্তিশালী বিতর্ক গড়ে তোলা- না যে কোনোভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা।
গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়, বরং নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান করা। যারা এই বাস্তবতা মেনে নিতে ব্যর্থ, তারা মূলত গণতন্ত্রের চেতনার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে- রাজপথের আন্দোলন নয়, বরং জনগণের রায়ে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার পথ ধরেই।
কে এম মোবারক উল্ল্যাহ শিমুল
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, লক্ষ্মীপুর জেলা