বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ০৮:১২ অপরাহ্ন
মানিক সরকার, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি :
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরকার গঠন করার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ফারাক্কা বাঁধের তীব্র সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে দেশের পানির সংকট মোকাবিলায় প্রস্তাবিত তিস্তা ব্যারেজ ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, ইনশাআল্লাহ এই বিএনপি সরকারই পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজের কাজে হাত দেবে। বুধবার দুপুরে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
আলোচনার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ছোটবেলায় আমরা দেখেছি পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যেত না। এখনো হয়তো বিশালতার কারণে দেখা যায় না, তবে তখন নদীতে প্রচুর পানি ছিল আর এখন নদীটি প্রায় পানিশূন্য। পদ্মা ব্যারেজের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুম—যেকোনো সময়েই যেন আমাদের দেশের মানুষ ও কৃষকেরা সব সময় পানি পান, মূলত সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এই ব্যারেজটি নির্মাণ করতে চাচ্ছি।
ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরেকটি বিপজ্জনক ব্যাপার হচ্ছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে ধীরে ধীরে আমাদের নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। নদীতে পানির প্রবাহ কম থাকায় দক্ষিণের সমুদ্রের নোনা পানি দেশের অভ্যন্তরে ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। ফলে সুন্দরবনসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে, গাছপালা নষ্ট হচ্ছে এবং বিভিন্ন বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। দেশের কৃষক ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতেই সরকার ব্যারেজের মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমের বাড়তি পানি ধরে রাখার পরিকল্পনা করছে, যা পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যাবে।
তিস্তা নদী নিয়ে চলমান বিভিন্ন আলোচনার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য এই ইস্যু নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলতে পারেন। তবে আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, যারা শুধু বড় বড় বা গরম কথা বলেন, তারা কাজের বেলায় নেই। দুর্যোগ মন্ত্রীর নেতৃত্বে তিস্তা অভিমুখে বিএনপিই একমাত্র দল যারা মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি পালন করেছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করেনি। বিএনপি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী এবং এই সরকারই তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজের বাস্তবায়ন করবে।
ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ২০ বছরে আমরা মাটির নিচ থেকে যে পরিমাণ পানি তুলে ব্যবহার করেছি, তা প্রাকৃতিকভাবে রিচার্জ হতে বা শূন্যস্থান পূরণ হতে আরও অন্তত ২০ বছর লাগবে। আগামী দিনগুলোতে জনসংখ্যা ও খাদ্য উৎপাদন আরও বাড়বে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, যা সরাসরি দুর্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই সংকট উত্তরণে দেশজুড়ে আবার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করার ওপর জোর দেন তিনি।
সীমান্তের ওপারে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগকে আমরা পুরোপুরি থামাতে পারব না, তবে দুর্যোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও ওয়াকিফহাল করতে পারি। আজকের অনুষ্ঠানের শপথ হওয়া উচিত—আমরা নিজেরা সচেতন হব এবং অন্যকেও সচেতন করব, যেন দুর্যোগের সময় মানুষ ও সম্পদ রক্ষা করা যায় এবং ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা একটি উন্নয়নশীল ও সীমিত সম্পদের দেশ। আমাদের অবহেলা বা অজ্ঞতার কারণে যদি দেশের সম্পদ নষ্ট হয়, তবে মানুষের দুর্ভোগ কেবল বাড়বেই। তাই পরিবেশ রক্ষা, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমাদের প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে। প্রকৃতিকে যত কম বিঘ্নিত করা যায়, সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন ও সচিব সাইদুর রহমান খান। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুল করিম রনি, গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান এবং গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবী।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণের পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন এবং একটি স্মারক বৃক্ষরোপণ করেন। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাতাইশ চৌরাস্তার ধরপাড়া এলাকায় প্রায় ৮ একর জমির ওপর এই আন্তর্জাতিক মানের ইনস্টিটিউটটি নির্মিত হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুর্যোগ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।